পিপিপি এবং ঢাকা উড়াল সড়ক
২রা সেপ্টেম্বর ২০২৩ ইং তারিখে বিকেলে কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার উড়ালসড়ক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সরকারি–বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) বড় প্রকল্পের একটি ঢাকা উড়াল সড়ক (ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) প্রকল্প। বাংলাদেশ ছাড়া থাইল্যান্ড ও চীনভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ এবং নির্মাণকাজের মাধ্যমে এই উড়ালসড়কের অংশীদার।
পিপিপি কি জানতে ক্লিক করুনঃ পিপিপি (PPP) কি ?
প্রকল্প যেভাবে এগিয়েছে
২০০৯ সালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়। উড়ালসড়কের পথ চূড়ান্ত করা ও নকশা প্রণয়নেই দুই বছর চলে যায়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে প্রথমে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি সই হয়। ওই বছর ৩০ এপ্রিলে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সাড়ে তিন বছরে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও পাঁচবার সময় বাড়ানো হয়।
ইতাল-থাই কোম্পানি পরে চীনের আরও দুটি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে। এগুলো হচ্ছে চীনের শেনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন এবং সিনো হাইড্রো করপোরেশন।
এর আগে ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ চায়না এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৪৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি করে তারা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না থেকে আরও ৪০০ মিলিয়ন ঋণ নেয়। সব মিলিয়ে প্রকল্পের বিপরীতে ৮৬১ মিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে চুক্তির অর্ধেক ঋণ ছাড় করেছে দুটি ব্যাংক। চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্ত এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার পরই কাজে গতি আসে। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরুর সময় ধরা হয় ২০২০ সালে।
“ঢাকা উড়াল সড়ক” এর পিপিপি চুক্তিতে কি আছে ?
চুক্তি অনুসারে, মূল কাঠামো নির্মাণ ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ জোগান দেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। আর ২৭ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ সরকার। যা ভায়াবিলিটি গ্যাপ (ভিজিএফ) নামে পরিচিত। ভিজিএফ হিসেবে সরকারের ২ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা দেওয়ার কথা মগবাজার পর্যন্ত অংশের কাজ শেষ হওয়ার পর।
বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি অনুসারে, উড়ালসড়ক দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৮০ হাজার যানবাহন চলাচল করবে বলে ধারণা করা হয়, আর সর্বনিম্ন যানবাহন চলাচল করতে পারে সাড়ে ১৩ হাজার। ৮০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করলে বাড়তি যে টোল আদায় হবে, এর ২৫ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে। অন্যদিকে সাড়ে ১৩ হাজারের চেয়ে কম যানবাহন চলাচল করলে বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সরকারের। চুক্তিতে বলা আছে, একটানা ১৫ দিন দৈনিক গড়ে সাড়ে ১৩ হাজারের কম যানবাহন চলাচল করলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিনিয়োগকারীকে চুক্তির চেয়ে বাড়তি সময় টোল আদায় করার সুযোগ দিতে হবে।
চুক্তি অনুসারে, বিনিয়োগকারীদের অধীনে থাকা অবস্থায় উড়ালসড়ক থেকে বাংলাদেশ ফি হিসেবে পাবে মাত্র ২৭২ কোটি টাকা। তবে তা একবারে নয়, বছর বছর দেবে তারা। কোন বছর কত টাকা দেবে, এর একটা তালিকাও চুক্তিতে রয়েছে।
উড়ালসড়ক নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ফাস্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এতে ইতাল–থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানির শেয়ার ৫১ শতাংশ। চীনের শেনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো–অপারেশন গ্রুপের মালিকানা ৩৪ শতাংশ। চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশনের শেয়ার ১৫ শতাংশ।
এর বাইরে উড়ালসড়কের জন্য জমি দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানো ও পরামর্শকদের ব্যয় মেটানোর দায়িত্বও বাংলাদেশ সরকারের। এ জন্য সাপোর্ট টু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামে আরেকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে সেতু বিভাগের। শুরুতে ২০১১ সালে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।
২৫ বছর পর মালিকানা পাবে বাংলাদেশ
চুক্তি অনুসারে, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নকশা প্রণয়ন, নির্মাণকাজের অর্থ জোগাড় করবে এবং উড়ালসড়ক চালুর পর তা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। ২৫ বছর পর বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীরা উড়ালসড়কটি হস্তান্তর করবে। এর আগে টোল আদায় করে বিনিয়োগ করা অর্থ সুদাসলে তুলে নেবে বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি অনুসারে, উড়ালসড়কটি ২৫ বছর তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর মধ্যে নির্মাণ সময় সাড়ে তিন বছর। অর্থাৎ বিনিয়োগকারী সাড়ে ২১ বছর টোল আদায় করে অর্থ নিয়ে যাবে। এ সময়ের মধ্যে কখনো টানা ১৫ দিন সাড়ে ১৩ হাজারের কম যানবাহন চলাচল করলে সময় বাড়িয়ে ক্ষতিপূরণ শোধ করতে হবে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Collusion in the Belgian Newspaper Distribution Sector
The Belgian competition authority has concluded its formal inquiry into systemic bid-rigging and horizontal agreements within the public procurement process

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক

সরকারি ক্রয়ে রেকর্ড ব্যবস্থাপনাঃ আইনি কাঠামো ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

লাম্প সাম নাকি টাইম-বেসড কন্ট্রাক্ট – কোনটি কখন ব্যবহার করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ে প্রধানত কাজের ধরন ও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হয়।