মন্ত্রীদের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতায় লাগামঃ নতুন বার্তা
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এতদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা স্ব-শাসিত সংস্থা বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্পগুলো যে কোনো অঙ্কের বাজেটে অনুমোদন করতে পারতেন, যা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। গত ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এই ক্ষমতা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন সিদ্ধান্তের মূল দিকসমূহ
সরকারি নির্দেশিকা সংশোধনের মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী:
- নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় যদি ৫০ কোটি টাকার বেশি হয়, তবে তা অবশ্যই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে।
- পরিকল্পনা কমিশনে যাচাই-বাছাই শেষে এই প্রকল্পগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করতে হবে, যার প্রধান হচ্ছেন সরকার প্রধান।
- তবে প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার নিচে হলে আগের মতোই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী তা অনুমোদন দিতে পারবেন।
কেন এই পরিবর্তন?
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, আগে এ ধরনের বড় অঙ্কের প্রকল্পগুলো কোনো গভীর সমীক্ষা বা যাচাই ছাড়াই মন্ত্রী পর্যায়ে অনুমোদিত হতো। এসব প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাইরে থাকায় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নজরদারি ও জবাবদিহির সুযোগ ছিল না। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে গাফিলতির মতো অভিযোগ উঠত। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার মতো সংস্থাগুলো নিজস্ব অর্থায়নে অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিলেও সেখানে কোনো স্বচ্ছতা থাকত না।
বাস্তব উদাহরণ ও অনিয়ম
প্রতিবেদনে রাজউকের পূর্বাচল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। নিজস্ব অর্থায়নে হওয়ায় রাজউক এটি নিজেরা অনুমোদন করতে চাইলেও পরিকল্পনা কমিশন তা একনেকে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এছাড়া মিরপুরের কালশীতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ‘স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্প’-এর দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে, যেখানে কাজ তিন বছর দেরি হওয়া সত্ত্বেও ফ্ল্যাটের দাম ৬৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭৮ লাখ টাকা করা হয়েছিল এবং কাজের মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
এই ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের জন্য নিম্নলিখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে:
প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতা: পরিকল্পনা কমিশন ও একনেকের মাধ্যমে যাওয়া প্রকল্প অনুমোদনে সময় বাড়াতে পারে, যা জরুরি প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত করতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের ধারণক্ষমতা: প্রচুর সংখ্যক বড় প্রকল্প যাচাই করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের সম্পদ ও দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা: মন্ত্রীদের সরাসরি ক্ষমতা কমে গেলেও, তারা অন্যান্য উপায়ে প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন। এই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
পরিশেষ
বাংলাদেশে স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা থেকে মন্ত্রীদের সরিয়ে দেওয়া একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অপচয় রোধে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। যদিও এর ফলে প্রকল্প অনুমোদনে কিছুটা সময় বাড়তে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের উন্নয়ন বাজেটের আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করবে। সরকারের এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে নিশ্চিত করা যে পরিকল্পনা কমিশন এবং একনেকের মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াটি দক্ষতার সাথে এবং অনাবশ্যক দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়। সাফল্যের জন্য সরকারকে পরিকল্পনা কমিশনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করতে হবে এবং একটি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। এই সংস্কারটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আরও জবাবদিহিতামূলক, দক্ষ এবং জনকল্যাণমুখী হবে বলে আশা করা যায়।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা