বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে চাঁদাবাজি: উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ও মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ
উন্নয়ন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সম্প্রতি সাভার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের জামসিং জয়পাড়া এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের জালিয়াতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালকদের জন্য এই ঘটনাটি মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রকল্পের বিবরণ ও আর্থিক সংস্থান: সাভার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ‘স্থানীয় সরকার কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (এলজিসিআরআরপি)’ আওতায় দুটি বড় উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে:
- ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটার ‘ইউনিব্লক’ সড়ক নির্মাণ।
- ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ।
এই প্রকল্প দুটি শতভাগ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এবং এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো আর্থিক অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা নেই।
প্রতারণার কৌশল ও নজিরবিহীন চাঁদাবাজি: উন্নয়ন প্রকল্পের নামে স্থানীয় একটি চক্র প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতারণার কৌশলগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার: মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, পৌরসভার প্রকৌশলী ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বড় অংকের টাকা না দিলে ড্রেন নির্মাণ করা হবে না।
ভয়ভীতি প্রদর্শন: বাসিন্দাদের ভয় দেখানো হয়েছিল যে, টাকা না দিলে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে ড্রেন নেওয়া হবে না।
প্রকৌশলীদের নাম ব্যবহার: পৌরসভার কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার অজুহাতে শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে সামর্থ্যভেদে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া: সাভার পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রকল্পে নাগরিকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা এই কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছেন যে পৌরসভা এই অনিয়মের দায় নেবে না।
সাভার পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই কাজগুলোর টেন্ডার অনেক আগেই হয়েছে এবং এখানে কাউকে অর্থ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জন্য শিক্ষণীয় ও করণীয়: এই ঘটনাটি সরকারি কর্মকর্তা, প্রকল্প পরিচালক এবং ঠিকাদারদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে আসে:
সচেতনতা বৃদ্ধি: প্রকল্পের শুরুতেই এটি যে শতভাগ দাতা সংস্থা বা সরকারি অর্থায়নে এবং জনগণের কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা নেই, তা প্রচার করা আবশ্যক।
তদারকি জোরদার: শুধুমাত্র নির্মাণকাজের মান তদারকি নয়, প্রকল্পের নামে কোনো সামাজিক অস্থিরতা বা চাঁদাবাজি হচ্ছে কি না, তা মাঠ পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব: ঠিকাদারদের উচিত তাদের কার্য এলাকায় স্থানীয় কোনো গোষ্ঠী যেন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে এ ধরনের চাঁদাবাজি দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। স্থানীয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় আনা, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এমন জালিয়াতির সাহস কেউ না পায়।
সোর্সঃ প্রকল্প বিশ্বব্যাংকের, মসজিদ মাইকে ঘোষণা দিয়ে নেওয়া হলো চাঁদা
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা