বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক কাঠামো। তাই ADP বাস্তবায়নের হার শুধু সরকারি ব্যয়ের একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয় (Public Procurement) এবং উন্নয়ন প্রশাসনের দক্ষতারও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–মে সময়ে ADP বাস্তবায়নের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার ধীরগতি (Procurement Delay) কতটা দায়ী, নাকি এর সঙ্গে আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যা জড়িত?
গত অর্থবছরের ADP বাস্তবায়নের চিত্র
Implementation Monitoring and Evaluation Division (IMED)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ADP বাস্তবায়নের হার ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ, যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন বাজেট অব্যয়িত (Unspent) থেকে গেছে।
বিশেষ করে পরিবহন, স্থানীয় সরকার, পানি সম্পদ এবং বৃহৎ অবকাঠামো খাতে ব্যয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে শুধু প্রকল্প শেষ হতে বিলম্বই নয়, বরং সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রভাবও কমে যেতে পারে।
Procurement Delay কি সবচেয়ে বড় কারণ?
সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপই হলো সময়মতো Procurement সম্পন্ন করা। দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, অনুমোদন, চুক্তি স্বাক্ষর এবং কার্যাদেশ প্রদান—এই প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হলে পুরো প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়ে যায়। অনেক প্রকল্পে দেখা যায়, অর্থবছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত Procurement-ই সম্পন্ন হয় না, ফলে কাজ শুরু হতে দেরি হয় এবং বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
তবে শুধু Procurement Delay-কে এককভাবে দায়ী করাও বাস্তবসম্মত হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে আরও কয়েকটি কারণ সমানভাবে প্রভাব ফেলছে। যেমন—ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, প্রকল্প নকশা ও ব্যয় প্রাক্কলনের পরিবর্তন, উন্নয়ন সহযোগীদের অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময়, আদালতে মামলা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ঠিকাদারদের সীমিত সক্ষমতা। অর্থাৎ, Procurement Delay একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও এটি বৃহত্তর Project Management সমস্যার অংশমাত্র।
e-GP থাকা সত্ত্বেও বিলম্ব কেন?
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সরকারি ক্রয়ে ১০০% e-GP বাস্তবায়ন করেছে। ফলে টেন্ডার আহ্বান, দরপত্র দাখিল ও মূল্যায়ন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, e-GP মূলত Tendering Phase-কে ডিজিটাল করেছে; প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপগুলো—বিশেষ করে Contract Management, কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, Variation Management, সময় বৃদ্ধি (Extension of Time) এবং বিল পরিশোধ—এখনও অনেকাংশে প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।
ফলে টেন্ডার দ্রুত সম্পন্ন হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি সব সময় বাড়ছে না। এটি ইঙ্গিত করে যে ভবিষ্যতের সংস্কার শুধু e-Tendering নয়, বরং সম্পূর্ণ Project Lifecycle Management-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ADP বাস্তবায়নের হার বাড়াতে শুধু দ্রুত টেন্ডার আহ্বান করাই যথেষ্ট নয়। প্রকল্প অনুমোদনের পরপরই Procurement Planning সম্পন্ন করা, বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ, Contract Management শক্তিশালী করা এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পগুলোর জন্য দক্ষ প্রকল্প পরিচালক, প্রশিক্ষিত Procurement Professionals এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
উপসংহার
ADP বাস্তবায়নের হার পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে নেমে আসা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এই পরিস্থিতিকে কেবল Procurement Delay-এর ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প পরিকল্পনা, ভূমি অধিগ্রহণ, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প পরিচালনার সামগ্রিক দক্ষতা—সবগুলো বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়াতে Procurement Reform-এর পাশাপাশি Project Management Reform-কেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই সরকারি বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন এবং সময়মতো ADP বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সোর্সঃ
- The Daily Star – ADP spending in July–May lowest in five years
https://www.thedailystar.net/business/economy/news/adp-spending-jul-may-lowest-5-years-4208481 - Implementation Monitoring and Evaluation Division (IMED) – ADP Implementation Status Reports
https://imed.gov.bd/
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা

পিডি নিয়োগে হচ্ছে নতুন নীতিমালা। কি আছে খসড়ায় ?
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের অদক্ষতা, ধীরগতি এবং স্বচ্ছতার অভাব দূর করতে সরকার প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতিতে আমূল