ইউরোপীয় শিল্প আইন: ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর প্রকিউরমেন্ট শক্তিতে ‘মেইড ইন ইউরোপ’ গড়ার মহাপরিকল্পনা
ইউরোপীয় কমিশন আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিলারেটর অ্যাক্ট’ (Industrial Accelerator Act) নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়া প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে এটি ‘মেড ইন ইউরোপ’ (Made in Europe) আইন হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য হলো কৌশলগত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়ন বা ভর্তুকি প্রদানের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর একটি নির্দিষ্ট অংশ ইউরোপের অভ্যন্তরে উৎপাদন নিশ্চিত করা। একজন নীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, এটি ইউরোপের বাণিজ্য নীতিতে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Thematic Analysis)
এই আইনটি প্রবর্তনের পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে:
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলা: চীন এবং অন্যান্য উদীয়মান শক্তিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদান করা। বিশেষ করে যেসব দেশে ইউরোপের মতো কঠোর পরিবেশগত রেগুলেশন বা উচ্চ জ্বালানি মূল্য নেই, তাদের অসম প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে এটি একটি প্রতিরক্ষা কবচ।
সরকারি ক্রয়ের (Public Procurement) ক্ষমতা ব্যবহার: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর বার্ষিক সরকারি ক্রয় খাতের বাজার প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা ব্লকের মোট জিডিপির প্রায় ১৪%। এই বিশাল অর্থপ্রবাহকে বিদেশি আমদানির পরিবর্তে স্থানীয় শিল্পে ধাবিত করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন: গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এবং সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে বিদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
খসড়া আইনটিতে সরকারি ক্রয় এবং উৎপাদন ভর্তুকির ক্ষেত্রে ‘ইউরোপ-মেড’ এবং ‘লো-কার্বন’ প্রয়োজনীয়তাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি ক্রয় ও ভর্তুকি (Public Procurement & Subsidies)
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, যখনই কোনো কৌশলগত খাতে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হবে, তখন পণ্যের উৎস হিসেবে ইউরোপকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এছাড়া জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পণ্যগুলোতে নির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড বা কার্বন নিঃসরণ সীমা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
কৌশলগত প্রযুক্তি খাত ও শর্তাবলী
নিচে আইনের আওতায় প্রস্তাবিত প্রধান খাত এবং সেগুলোর জন্য নির্ধারিত শর্তাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত সারণি প্রদান করা হলো:
|
খাত
|
অন্তর্ভুক্ত প্রযুক্তিসমূহ
|
শর্তাবলী ও লক্ষ্যমাত্রা
|
|---|---|---|
|
জ্বালানি উৎপাদন
|
সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র
|
সৌর প্যানেলের ইনভার্টার ও প্রধান উপাদানগুলোর উৎপাদন বাধ্যতামূলকভাবে ইউরোপীয় হতে হবে।
|
|
শক্তি সঞ্চয় ও সরবরাহ
|
ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং হাইড্রোজেন উৎপাদন
|
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতগুলোতে বিদেশি আধিপত্য হ্রাস করা।
|
|
পরিবহন খাত
|
বৈদ্যুতিক যান (Electric Vehicles)
|
গাড়ি অবশ্যই ইউরোপে অ্যাসেম্বল হতে হবে এবং ব্যাটারি বাদে উপাদানের ৭০% (মূল্য অনুযায়ী) ইউরোপীয় হতে হবে।
|
|
মৌলিক শিল্প
|
অ্যালুমিনিয়াম এবং কনক্রিট
|
অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে ২৫% এবং কনক্রিটের ক্ষেত্রে ৫% স্থানীয় উৎপাদনের শর্ত।
|
- সৌর প্যানেল: ইনভার্টার এবং দুটি প্রধান উপাদান এক বছরের মধ্যে ইউরোপে তৈরি হতে হবে, যা পরবর্তী দুই বছরে তিনটি উপাদানে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
- স্টিল শিল্প: পরিবেশবান্ধব উৎপাদন উৎসাহিত করতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের তীব্রতা অনুযায়ী একটি ‘স্বেচ্ছামূলক লেবেলিং’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি মূলত একটি ‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’ হিসেবে কাজ করবে, যা কম কার্বন নিঃসরণকারী স্থানীয় উৎপাদনকারীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সুবিধা দেবে।
বিদেশি বিনিয়োগের শর্তাবলী (Foreign Investment Conditions)
কৌশলগত খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খসড়া প্রস্তাবে অত্যন্ত কঠোর ও রক্ষণশীল শর্ত আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিচের শর্তগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
- যদি কোনো বিনিয়োগকারী দেশ সংশ্লিষ্ট খাতের বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০% বা তার বেশি নিয়ন্ত্রণ করে (যা মূলত ব্যাটারি এবং সৌর খাতে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে), তবে তাদের জন্য বিশেষ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে।
- বিনিয়োগকারী কোনো ইউরোপীয় কোম্পানির সংখ্যাগুরু শেয়ার (Majority Stake) বা নিয়ন্ত্রণমূলক মালিকানা গ্রহণ করতে পারবে না।
- ইউরোপীয় বাজারের সুবিধা নিতে হলে বিনিয়োগকারীকে তাদের মেধা সম্পদ (Intellectual Property) লাইসেন্স প্রদান করতে হবে, যাতে ইউরোপীয় শিল্প সেই প্রযুক্তিগত সুবিধা ভোগ করতে পারে।
‘ইউরোপ’ এর সংজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
এই আইনের অধীনে ‘ইউরোপ’ বলতে ‘ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (EEA)-কে বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি ইইউ সদস্য দেশসহ আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন এবং নরওয়ে অন্তর্ভুক্ত।
ব্রিটেনের অবস্থান: ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেন এই সংজ্ঞার বাইরে রয়েছে, যা সমন্বিত সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে নতুন করে জটিলতা বা ফ্রিকশন তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্ব: তবে কমিশন ভবিষ্যতে ‘ট্রাস্টেড পার্টনার’ বা বিশ্বস্ত অংশীদার দেশগুলোকে এই তালিকায় যুক্ত করার পথ খোলা রেখেছে, যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে (যেমন WTO-এর প্রকিউরমেন্ট এগ্রিমেন্ট) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শিল্প খাতে সম্ভাব্য প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
আইনটি নিয়ে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক ও শিল্প নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
সমর্থক: ফ্রান্স এবং ইউরোপের প্রায় ১,১০০-এর বেশি ব্যবসায়ী নেতা এই জাতীয়তাবাদী শিল্প নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
উদ্বিগ্ন পক্ষ: গাড়ি নির্মাতারা তাদের বিশাল এবং জটিল বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় এই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
সংশয়ী পক্ষ: জার্মানির সিডিইউ (CDU) নেতা ফ্রেডরিখ মার্জ এই প্রস্তাবের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ‘মেড-ইন-ইউরোপ’ এর পরিবর্তে ‘মেড-উইথ-ইউরোপ’ (Made-with-Europe) ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন যাতে বাণিজ্য অংশীদাররা ক্ষুব্ধ না হয়। অন্যদিকে সুইডেন ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলো মনে করে এটি বিনিয়োগ হ্রাস এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
বিশেষ ছাড় ও ব্যতিক্রমসমূহ (Exceptions)
বাস্তবতা বিবেচনায় খসড়া প্রস্তাবে ‘ইউরোপ-মেড’ শর্ত শিথিল করার একটি ‘লুপহোল’ বা সুযোগ রাখা হয়েছে:
যদি সংশ্লিষ্ট পণ্যটি বিশ্বজুড়ে কেবল একটি কোম্পানি উৎপাদন করে এবং ইউরোপে তার বিকল্প না থাকে।
যদি ইউরোপীয় পণ্য ব্যবহারের ফলে প্রকল্পের সামগ্রিক খরচ ৩০% বা তার বেশি বৃদ্ধি পায় – এটি মূলত বাজেট-সচেতন সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ ছাড়।
উপসংহার
‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিলারেটর অ্যাক্ট’ ইউরোপীয় বাণিজ্য নীতিতে ‘প্রটেকশনিজম’ (Protectionism) বা সংরক্ষণবাদ এবং ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy)-এর দিকে একটি শক্তিশালী মোড়। যদিও এটি স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা, তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়মাবলীর সাথে এর সামঞ্জস্য এবং সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সম্মতির ওপর। খসড়া রূপরেখাটি এখনও চূড়ান্ত নয় এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আলোচনার মাধ্যমে এর অনেক ধারা পরিবর্তিত হতে পারে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Collusion in the Belgian Newspaper Distribution Sector
The Belgian competition authority has concluded its formal inquiry into systemic bid-rigging and horizontal agreements within the public procurement process

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক

সরকারি ক্রয়ে রেকর্ড ব্যবস্থাপনাঃ আইনি কাঠামো ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

লাম্প সাম নাকি টাইম-বেসড কন্ট্রাক্ট – কোনটি কখন ব্যবহার করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ে প্রধানত কাজের ধরন ও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হয়।