Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

UNDP তে আমার অভিজ্ঞতাঃ পেশায় ভিন্ন ছোঁয়া

Facebook
Twitter
LinkedIn

মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ
অতিঃ প্রধান প্রকৌশলী,
গণপূর্ত অধিদপ্তর।

 

অস্ট্রেলিয়ায় অর্জিত উচ্চশিক্ষা এবং আধুনিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কলাকৌশল বাস্তব কাজে ব্যবহারের চেষ্টা চালাতে লাগলাম। লব্ধজ্ঞান আর প্রাপ্ত আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে সময়াবদ্ধ ও মানসম্পন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরবিচ্ছিন্ন কাজ করার পাশাপাশি গণপুর্তসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও যুক্ত হলাম।

এভাবে চলতে চলতেই ভাবনার রাজ্যে ঢুকে গেল বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির বাসনা। সরকার তো সর্বোচ্চ পাঁচ বছর লিয়েন ছুটি দেবে, এ ভেবেই বিষয়টি নিয়ে ২০০৮ সাল থেকেই সিরিয়াস হলাম। অর্জিত শিক্ষা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত আর্থিক ভিতকেও কিছুটা মজবুত করা যাবে।

লিয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ ছুটি, ডেপুটেশন, নাকি লিয়েন ?

ইউএনডিপি, এডিবি, নোরাড, আইএলও, সিডা, ইউএনএফপিএ, বিশ্বব্যাংক আরও কত-কী। গণপূর্তের চাকরির পাশাপাশি পত্রপত্রিকা আর ওয়েবসাইটে নজর রাখছি। বিদেশে নয়, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ প্রকল্পের দিকেই আমার আগ্রহ বেশি। সেভাবেই অনলাইনভিত্তিক আবেদন করতে লাগলাম। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন – প্রায় সব জায়গায় আমার উপযোগী পদের বিপরীতে আবেদন করি আর অপেক্ষায় থাকি কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছি না।

এবার আবেদনের স্টাইল পরিবর্তন করে সিভি, ব্যক্তিগত প্রোফাইল, ছবিসহ কাজের অভিজ্ঞতা, কভার লেটার, সমৃদ্ধ রেফারেন্সসহ আবেদন করতে লাগলাম। দ্রুতই ফল পাচ্ছি বলে মনে হলো, আমাকে শর্ট লিস্টেড করা শুরু করল, ইন্টারভিউর ডাকও পেতে থাকলাম। লিখিত, মৌখিক, ওয়াক ইন আলোচনা – সব স্তর পেরিয়ে চুড়ান্ত মনোনয়ন সহজে ধরা দিচ্ছে না। তবে, আমিও হাল ছাড়ার পাত্র নই। শুধুই মনে হতো, ছন্দ যেহেতু ফিরে পেয়েছি, সফলতা ইনশাআল্লাহ আসবেই।

২০১০-এর প্রথম ভাগে বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি আর এডিবিতে আবেদন করি। যথারীতি শর্ট লিস্টেড হলাম। কম্পিউটার বেইজভ পরীক্ষা দিয়ে পরের ধাপ ভাইভা পর্যন্ত দিয়ে ফেললাম। জুন মাসে পেলাম শুভসংবাদ – ইউএনডিপির প্রকল্পে নিয়োগের জন্য অফার লেটার পেলাম। স্বস্তি পেলাম, এবার আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিজেকে প্রমাণের পালা। সত্যিই পেশাদার জীবনে এ এক অনাবিল প্রশান্তি! যাক, দ্রুতই সরকারি লিয়েন আদেশ পেয়ে ইউএনডিপির মানবসম্পদ বিভাগের সঙ্গে চুড়ান্ত চুক্তি সই করে ফেললাম। আগস্ট মাসের ১ তারিখে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যোগদান।

কনস্ট্রাকশন অ্যাড ভাইজর, পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম (পিআরপি), ইউএনডিপি, বাংলাদেশ। এখন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর এটাই আমার পদ-পদবি। যোগদানের দিনই প্রকল্প ব্যবস্থাপক একটা “ওয়েলকাম প্যাক” দিয়ে স্বাগত জানালেন। প্রকল্পের মূল দলিল, কর্মপদ্ধতি, সহকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল যোগাযোগ, ওয়ার্ক স্টেশন ব্যবহার, গাড়ি ব্যবহার, সাইট পরিদর্শনসহ প্রাথমিক সব তথ্যাদি এ প্যাকে রয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক হেন্ক ফন জিল একজন ভাচ বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান, সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার ছিপছিপে গড়নের ভদ্রলোক। আমার পেশাদারি অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ গুলো অবহিত করলেন। এদিকে প্রকল্পের অন্য দেশি-বিদেশি সহকর্মীরা একে একে আমার ওয়ার্ক স্টেশনে এসে পরিচিত হয়ে গেলেন। মোদ্দাকথা, বহুসংস্কৃতির কর্মপরিবেশে নতুন সহকর্মীকে স্বল্পতম সময়ে আপন করে নেওয়ার আন্তর্জাতিক ভার্সন দেখে আমি অভিভূত!

এদিকে সপ্তাহখানেকের মধ্যে এডিবি থেকেও নিয়োগপত্র হাতে পেলাম। ভাবলাম, গিট্টু তাহলে খুলল! যাক, ইউএনডিপির কাজের চাপে সেদিকে আর ভাববার ফুরসতই পাইনি।

ইউএনডিপি সম্পর্কে দু’একটি কথা না বললেই নয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (UNDP) বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। এটি বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের সঙ্গে কাজ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করে। ইউএনডিপির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা একজন পেশাজীবীর জীবনে যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ, তেমনি দক্ষতা বৃদ্ধিরও সহায়ক। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পেশাদাররা একত্রে কাজ করেন। এ বৈচিত্র্য শুধু কর্মক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করে না, বরং একজন পেশাজীবীর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে। বিশেষত, ইউএনডিপির প্রশিক্ষণ কর্মসুচি একজন পেশাজীবীকে সংস্থার কাজের কৌশল, মুল্যবোধ এবং নীতিমালা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে। যা-ই হোক, পিআরপি প্রকল্পের ছয়টি অঙ্গের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন অঙ্গের দায়িত্ব আমার ও আমার টিমের। নির্মাণকাজের মধ্যে সারা দেশে মূলত ছয়টি মডেল থানা কমপ্লেক্স, ছয়টি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, ১৮টি সার্ভিস ডেলিভারি সেন্টার উল্লেখযোগ্য।

ইউএন প্রতিষ্ঠানে চাকরির শুরুতেই ‘নিরাপত্তা’ বিষয়ক অনলাইন – অফলাইনভিত্তিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও সনদ অর্জন বাধ্যতামূলক, সেমতে আমিও ইউএনডিএসএস থেকে নিরাপত্তাবিষয়ক কয়েকটি সনদ পেলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি আমার কাজ বুঝে নিলাম, নিরাপত্তাবিষয়ক ছাড়পত্র নিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সাইট ভিজিটও শুরু করলাম। ইউএন – লোগোর জিপ ব্যবহারে মনে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করল। প্রায়ই অন্য সহকমীদের সঙ্গেও প্রকল্প সাইট পরিদর্শনে যেতাম। অস্ট্রোলিয়ার জেরার্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দ্রে রেডম্যান, নেপালের কৈরালা, অস্ট্রেলিয়ার ভয়চেক, ইউকের মাইকেলের সঙ্গে খুব দ্রুতই মানিয়ে নিলাম। দাপ্তরিক কাজ ছাড়াও খেলাধুলা, বিশেষ করে ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতির কমতি ছিল না। এদের নিয়ে মিরপুর স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখার স্মৃতি আজও অমলিন।

আমাদের মতো কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে কিছু ‘কালচারাল শক’ রয়েছে । এখানে অফিস সময় সাড়ে আটটা, মানে সাড়ে আটটা। কোনো পিয়ন নেই, নেই কলবেল, নেই কোনো সাহায্যকারী, নিজের কাজ শতভাগ নিজেকেই সারতে হয়। আলাদা রুমের কোনো ব্যাপার নেই, সবাই একছাদের নিচে আলাদা ওয়ার্ক স্টেশনে নিজ নিজ কম্পিউটারে কাজ করে। মাসের শেষ তারিখে অ্যাকাউন্টে বেতন কিংবা দৈনিক ভাতা নিয়ম মেনে জমা হয়ে যায়। এখানে পত্র যোগাযোগে হার্ডকপির বালাই নেই বললেই চলে। ই-মেইল বা ভার্চুয়াল কমন প্ল্যাটফর্মেই যাবতীয় কাজ, কাগজবিহীন বা গ্রিন অফিস কর্মকাণ্ডই সবার আগে। সহকর্মীরা বস বা স্যার নয়, সবাই মিস্টার বা মিস! যেকোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে ইউএনডিপির অফিস ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা বাসা থেকে কাজ’ ঘোষণা করা হতো।

এভাবেই কাজে ডুবে থেকে ২০১০ থেকে ২০১৫ একে একে পাঁচটি বছর চোখের পলকে কীভাবে পেরিয়ে গেল, বলতে গেলে টেরই পাইনি! সময়ের স্রোতে আমি পুরো প্রকল্প পরিবারের অন্যতম সদস্য হয়ে গেলাম। সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ, সহকর্মীর বার্থডে পালন, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন, সভা অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন – সব জায়গায়ই আমার সরব ও কার্যকর উপস্থিতি থাকছেই। এ ছাড়া পুরো টিম নিয়ে বছরান্তে বিভিন্ন অবকাশকেন্দ্রে ফিড ব্যাক নামক ওয়ার্কশপ বা সেমিনার ইউএনডিপির কাজের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যাই হোক, আমার কাজও শেষ, চুক্তিও শেষ। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই সহকর্মীদের উপস্থিতিতে আমাকে বিদায় জানাল। আমিও ভগ্নহৃদয়ে সবাইকে ‘গুড বাই’ জানিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার চাকরির ঘটনাবহুল জার্নি শেষ করলাম।

ইউএনডিপির সঙ্গে পাঁচ বছর কাজ আমার পেশাগত জীবনে শুধু একটি অধ্যায় নয়; বরং এটি আমার জীবনের অন্যতম একটি স্বর্ণ-সময়। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়েছে। ইউএনডিপির বহুসংস্কৃতির কর্মপরিবেশে কাজের এ অভিজ্ঞতা আমার মতো পেশাজীবীর জন্য একটি অনন্য এবং মুল্যবান অভিজ্ঞতা, যা এ জীবনে ভোলার নয়।


🔴🔵🟢 প্রকিউরমেন্ট, সাপ্লাই-চেইন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে আপনিও লিখতে পারেন। প্রাসঙ্গিক হলে ‘প্রকিউরমেন্টবিডি’তে প্রকাশ করা হবে।


বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ উপরের লিখাটি লেখকের “পেশায় ভিন্ন ছোঁয়াঃ অভিজ্ঞতার ভান্ডারে ইউএনডিপি” নামে “স্বপ্নদ্রষ্টা প্রকৌশলীর দেশ বিদেশের আত্মকথন” বইয়ে সংকলিত হয়েছে। বইটি ২০২৫ এর বই মেলায় আদর্শ প্যাভিলিয়ন (নং ২৬) এ পাওয়া যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors
গ্রাহক হোন

শুধুমাত্র Registered ব্যবহারকারিগন-ই সব ফিচার দেখতে ও পড়তে পারবেন। এক বছরের জন্য Registration করা যাবে। Registration করতে এখানে ক্লিক করুন

 

** সীমিত সময়ের জন্য Discount চলছে।

ফ্রী রেজিস্ট্রেশন

“প্রকিউরমেন্ট বিডি news”, “সমসাময়িক”, “সূ-চর্চা”, “প্রশিক্ষণ” অথবা “ঠিকাদারী ফোরাম” ইত্যাদি বিষয়ে কমপক্ষে ২টি নিজস্ব Post প্রেরণ করে এক বছরের জন্য Free রেজিষ্ট্রেশন করুণ। Post পাঠানোর জন্য “যোগাযোগ” পাতা ব্যবহার করুণ।

সূচীঃ PPR-25

সর্বশেষ

Scroll to Top