১ম সংসদ অধিবেশনঃ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ
আজ শুরু হচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই অধিবেশনকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা একাধিক অধ্যাদেশ সংসদের আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫”।
এই অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার আইনগত স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদের বিবেচনায়
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সংস্কারের অংশ হিসেবে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর এসব অধ্যাদেশ সংসদের সামনে উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক। ফলে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হতে পারে।
এই তালিকায় সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর একটি হলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫।
কেন জারি করা হয়েছিল এই অধ্যাদেশ
সরকার ৪ মে ২০২৫ তারিখে “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” জারি করে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।
পরবর্তীতে এই সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে নতুন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ (PPR 2025) জারি করা হয়।
ফলে বর্তমানে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একটি বড় অংশই এই নতুন বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে আরও দেখুনঃ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারী
সংবিধান কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(২) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা কোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করতে হয়।
সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে যদি সেটি আইন হিসেবে অনুমোদিত না হয়, তাহলে অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারায়।
এই বাস্তবতায় “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” সংসদে আইনে পরিণত হবে কিনা – তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।
আইনে পরিণত না হলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
যদি এই অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদিত না হয়, তাহলে এর ভিত্তিতে প্রণীত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ (PPR 2025)-এর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এক্ষেত্রে সরকারকে সম্ভাব্যভাবে—
- নতুন করে বিধিমালা সংশোধন করতে হতে পারে
- পূর্ববর্তী আইনগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে হতে পারে
- চলমান কিছু ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে
- ই-জিপি প্লাটফর্মেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে যা অনেক সময় সাপেক্ষ।
ফলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় সাময়িক নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অধ্যাদেশ থেকে আইন হওয়ার প্রক্রিয়া
অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার জন্য সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়—
- মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব প্রস্তুতঃ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তরের প্রস্তাব তৈরি করে।
- মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনঃ প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
- আইন খসড়া প্রস্তুতঃ অনুমোদনের পর বিলের খসড়া তৈরি করা হয়।
- সংসদে উত্থাপনঃ বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়।
- সংসদীয় আলোচনা ও কমিটি পর্যালোচনাঃ বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হতে পারে।
- ভোটগ্রহণ ও পাসঃ সংসদের ভোটে পাস হলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ: পাবলিক প্রকিউরমেন্টের দৃষ্টিকোণ
বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি সেবা প্রদান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন – সব ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।
এ কারণে আইনগত কাঠামোর ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হয়, তাহলে—
✔ নতুন পিপিআর ২০২৫-এর আইনগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে
✔ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে
✔ ই-জিপি ভিত্তিক ক্রয় কার্যক্রমের সম্প্রসারণ সহজ হবে
✔ প্রকিউরমেন্ট সেক্টরে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে
প্রকিউরমেন্ট কমিউনিটির নজর এখন সংসদের দিকে
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষ – যেমন ক্রয়কারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালক, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি, ঠিকাদার, সরবরাহকারী, পরামর্শক এবং উন্নয়ন সহযোগীরা – এই অধ্যাদেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল আইনগত কাঠামোই সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে।
উপসংহার
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন প্রশাসনিক ও আইনগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই অধিবেশনে “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” আইনে পরিণত হবে কিনা – তার ওপর নির্ভর করতে পারে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার বর্তমান আইনগত কাঠামোর ভবিষ্যৎ।
ফলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই এখন সংসদের সিদ্ধান্তের দিকে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

SLT: টেন্ডারে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় (Public Procurement) দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল অস্বাভাবিক কম দর (Abnormally Low Bid – ALB)

NOA অটোমেটিক accepted দেখাচ্ছে। এখন করণীয় কি ?
একটি টেন্ডারে কর্তৃপক্ষ আমার প্রতিষ্ঠানের নামে NOA (Notification of Award) ইস্যু করেছে, ই-জিপিতে মেসেজ এসেছে। কিন্তু আমি এক্সেপ্ট করতে গিয়ে

NEOM & The Line: একটি কৌশলগত প্রকল্প এবং ক্রয় পরিকল্পনার মহাবিপর্যয়
বিস্তারিত দেখুনঃ NEOM & The Line: একটি কৌশলগত প্রকল্প এবং ক্রয় পরিকল্পনার মহাবিপর্যয়

Individual Consultancy চুক্তিতে ভ্যাট এবং আয়করের হার নিয়ে হতাশা
বিস্তারিত দেখুনঃ ব্যক্তি পরামর্শক (Individual Consultant) চুক্তিতে ভ্যাট এবং আয়করের হার নিয়ে হতাশা