যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ক্রয় জালিয়াতিতে রেকর্ড জরিমানা: একটি বিশেষ প্রতিবেদন
২০২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ – Department of Justice) ফলস ক্লেইমস অ্যাক্ট (FCA – False Claims Act) এর অধীনে রেকর্ড ৬.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উদ্ধার করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ পুনরুদ্ধারের নজির।
এই সাফল্যের মূলে ছিল সরকারি ক্রয় (Procurement), বিশেষ করে সামরিক কেনাকাটা, সাইবার নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক শুল্ক জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম। সরকারি তহবিলের সুরক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত এই কার্যক্রমগুলো বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিক সাফল্য
২০২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিভিন্ন জালিয়াতি এবং অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত ৬.৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পুনরুদ্ধার করেছে। এটি এফসিএ-এর ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ পুনরুদ্ধারের রেকর্ড। ১৯৮৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট পুনরুদ্ধারের পরিমাণ ৮৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
সামরিক ক্রয় জালিয়াতি (Military Procurement Fraud)
অ-স্বাস্থ্যসেবা খাতের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমের মধ্যে সামরিক ক্রয় জালিয়াতির বিষয়টি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল।
বিচার বিভাগ একটি সামরিক ক্রয় জালিয়াতির মামলায় ৪২৮ মিলিয়ন ডলার আদায় করেছে, যা তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রয় জালিয়াতির মামলা হিসেবে বিবেচিত।
এই মামলার প্রধান অভিযোগ ছিল মিথ্যা ব্যয় ও মূল্যের তথ্য প্রদান (false cost and pricing data) এবং একই কাজের জন্য দ্বিগুণ বিল (double billing) করা।
সাইবার সিকিউরিটি ও ক্রয় চুক্তি
সরকারি চুক্তির ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রাখা এখন এনফোর্সমেন্টের অন্যতম অগ্রাধিকার।
‘সিভিল সাইবার ফ্রড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় ৯টি ভিন্ন ঘটনায় ৫২ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
চুক্তি বা গ্র্যান্টের ক্ষেত্রে যথাযথ সাইবার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকা এবং ভুল তথ্য প্রদানের (accurate attestations) অভিযোগে এসব জরিমানা করা হয়। গত দুই বছর ধরে এই খাতে জরিমানার পরিমাণ প্রতি বছর তিনগুণেরও বেশি বাড়ছে।
মহামারীকালীন সহায়তা তহবিলের জালিয়াতি
২০২৫ অর্থবছরে প্যানডেমিক রিলিফ প্রোগ্রাম বা মহামারীকালীন সহায়তা তহবিল (যেমন: Paycheck Protection Program) সংক্রান্ত ২০০টিরও বেশি মামলায় ২৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এই কর্মসূচিগুলোতে এ পর্যন্ত মোট পুনরুদ্ধারের পরিমাণ ৮২০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বাণিজ্য ও শুল্ক সংক্রান্ত জালিয়াতি (Trade and Tariff Fraud)
সরকারি ক্রয় এবং আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অ্যালাইড স্টোন ইন্ক (Allied Stone, Inc.) চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ধরন গোপন করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে ২১.৪ মিলিয়ন ডলার জরিমানা প্রদান করেছে।
এ ছাড়াও পণ্যের উৎস দেশ (Country of Origin) নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার জন্য এভোলিউশন ফ্লোরিং (৮.১ মিলিয়ন ডলার), গ্লোবাল প্লাস্টিক (৬.৮ মিলিয়ন ডলার) এবং গ্রসফিলেক্স (৪.৯ মিলিয়ন ডলার) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় অংকের জরিমানা করা হয়েছে।
তথ্যদাতার ভূমিকা
২০২৫ সালে সরকারি জালিয়াতি উন্মোচনে হুইসেলব্লোয়ারদের বা তথ্যদাতার ভূমিকা ছিল রেকর্ড ব্রেকিং।
এ বছর মোট ১,২৯৭টি কুই ট্যাম (qui tam) বা হুইসেলব্লোয়ার মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই মামলাগুলোর মাধ্যমে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, পুনরুদ্ধার করা অর্থের ১৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত তথ্যদাতারা পুরস্কার হিসেবে পাওয়ার যোগ্য।
ভবিষ্যৎ সতর্কবার্তা ও সুপারিশ
বিচার বিভাগের এই কঠোর অবস্থান সরকারি ঠিকাদার এবং সরবরাহকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার বাড়িয়ে জালিয়াতি শনাক্ত করার প্রক্রিয়া আরও আধুনিক করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সময়মতো নিজেদের অনিয়ম স্বেচ্ছায় প্রকাশ (self-disclosure) করে এবং তদন্তে সহযোগিতা করে, তবে তারা জরিমানার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা বা ক্রেডিট পেতে পারে।
উপসংহার
২০২৫ সালের এই রেকর্ড পরিমাণ জরিমানা এটাই প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং করদাতার অর্থের অপচয় রোধে অত্যন্ত কঠোর। বিশেষ করে সামরিক ক্রয়, সাইবার নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত শুল্ক আইন পালনে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হচ্ছে না।
সংক্ষেপে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যথাযথ আইনি মানদণ্ড অনুসরণ করা এবং যে কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রদান থেকে বিরত থাকাই হলো এই রেকর্ড এনফোর্সমেন্ট থেকে মূল শিক্ষা।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

সংশোধিত বাজেটের কতিপয় ব্যয় কাটছাঁটে পরিপত্র জারি। যে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি !!!
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সংশোধিত বাজেটের ব্যয়ে বড় ধরনের

e-GP টেন্ডারে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা জমার ক্ষেত্রে কখন কোন Mode of Payment প্রযোজ্য ?
সাধারণত, ই-জিপি দরপত্রের ক্ষেত্রে দরপত্র দলিল বা টেন্ডার ডকুমেন্ট (Tender Document) বা সিডিউল ব্যাংক থেকে বিপিপিএ কর্তৃক নির্ধারিত হারে ক্রয়

Will Everyone Have Equal Opportunity in Tenders? Court Directives
Public procurement is traditionally considered an open competitive process where any qualified bidder can participate. However, in the current era

Open Tender হলেই কি সবাই সমান সুযোগ পাবে ? একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা
Public procurement এ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা সাধারণত সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে যেকোনো যোগ্য bidder অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু