দাপ্তরিক প্রাক্কলনে (estimate) অ্যানালাইসিস আইটেম বন্ধ করা হোক
খান মুজাহিদ মুহাম্মাদ
©লেখক: স্বত্বাধিকারী, মিনার ইন্টারন্যাশনাল; ঠিকাদার, লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগ।
সরকারি নির্মাণ বা মেরামত কাজের ক্ষেত্রে যা যা প্রয়োজন, তার সবকিছুই বাস্তবায়নকারী সংস্থার সিডিউল অব রেটস বা দরবহিতে থাকবে, এমনটা নাও হতে পারে৷ সিডিউল অব রেটসকে রেটকোডও বলা হয়ে থাকে। কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজন কিন্তু সিডিউল অব রেটস বা রেটকোডে নেই, বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক দর দাঁড় করানো হয়। সহজ কথায় এটাই অ্যানালাইসিস আইটেম। এটা সত্য যে, সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেটকোডেও কিছু আইটেম নেই, কাজের বাস্তবতায় যা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো— গণপূর্ত ছাড়াও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানই গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেটকোড মেনে টেন্ডার সম্পন্ন করে। তারা অবশ্য গণপূর্তের রেটকোডে থাকা আইটেম দিয়েই টেন্ডার করাচ্ছে, কিন্তু গোল বাঁধাচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিজেই!
সর্ষের মধ্যেই ভূত?
গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডারগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে – মোট টেন্ডারের ৫০ ভাগেই অ্যানালাইসিস আইটেম রাখা হচ্ছে। সত্যি বলতে – নতুন ও বড়ো কাজ এবং লাভজনক কাজের সবগুলোতেই অ্যানালাইসিস আইটেমের সন্নিবেশ থাকছে। বাস্তবে যার ৯৫ শতাংশই অপ্রয়োজনীয় মনে হয় অথবা হয়তো এড়ানো যেত। এ বিষয়ে পরের অংশে তুলে ধরা হল।
কীভাবে করা হয় রেট অ্যানালাইসিস?
ধরা যাক, কোনো কাজে টুইন বিব কক প্রয়োজন, যা গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেটকোডে নেই। সেক্ষেত্রে বাজার যাচাই করে টুইন বিব ককের আইটেম তৈরি করা হবে। সম্প্রতি রংপুর গণপূর্ত জোনের রংপুর সার্কেলের অধীন একটি ডিভিশনের টেন্ডারে ওই জেলার সদর হাসপাতাল সংস্কার কাজে অ্যানালাইসিস আইটেম হিসেবে টুইন বিব কক এস্টিমেটে ছিল। রেট অ্যানালাইসিসে দেখা যায় একটি সিপি টুইন বিব ককের বাজারমূল্য ১৪৯৫ টাকা ধরে পরিবহন খরচ বাবদ ১০০ টাকা যোগ করা হয়েছে। ফিটিং/ফিক্সিং ম্যাটারিয়াল হিসেবে দুটি থ্রেড টেপের দাম ২৫ টাকা দরে ৫০ টাকা৷ জনবল— ০.২ জন দক্ষ শ্রমিক ও ০.২ জন অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি যথাক্রমে ৭৮ ও ৬৪ টাকা। এভাবে মোট খরচ ১৭৮৭ টাকার সঙ্গে ঠিকাদারের লাভ ১০%, ওভারহেড কস্ট ৩.৫% আর ৭% ভ্যাট মিলিয়ে আইটেমটির প্রস্তাবিত দর ২১৭৯ টাকা ২৮ পয়সা তথা ২১৭৯ টাকা। প্রস্তাবিত দরটিই অবিকল অনুমোদন করেছেন রংপুর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং আইটেমটি যথারীতি একাধিক কাজের টেন্ডারে প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি ৫/১০ লাখ টাকার ছোটো রিপেয়ার কাজেও সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী তা প্রয়োগ করেছেন। যদিও কাজ চালানোর মতো বিব ককের একাধিক আইটেম গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেডকোডেই আছে। যেমন PWD সিডিউল অব রেটস ২০১৮, সিভিল ওয়ার্ক আইটেম কোডঃ 26.52 থেকে 26.57।
‘প্রকিউরমেন্ট বিডি’ তে আপনার নিজস্ব কোন Post প্রেরণ করে এক বছরের জন্য Free রেজিষ্ট্রেশন গ্রহন করুণ। Post পাঠানোর জন্য “যোগাযোগ” পাতা ব্যবহার করুণ।
রেট অ্যানালাইসিসের ফাঁকি?
সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী বা প্রাক্কলনিকের বাজার যাচাইয়ে যে সিপি বিব ককের দাম ১৪৯৫ টাকা অন্য কেউ বাজারে গেলে সেটার দাম যে ১৪০০ বা ১৬০০ টাকা হবে না, তার কী গ্যারান্টি ? বাজার থেকে সাইটে পরিবহন ব্যয় ২০ টাকাও তো হতে পারে, আবার ২০০ টাকা হওয়াও বিচিত্র নয়। ফিক্সিং ম্যাটারিয়াল হিসেবে ২ টি থ্রেড টেপের হিসাব দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো প্রকৌশলী তা ১ টিও দিতে পারেন। তৃতীয় কেউ যে ৩ টি দেবেন না, তারও নিশ্চয়তা নেই। জনবল যে হারে দেখানো হয়েছে তাতে ১ জন দক্ষ ও ১ জন অদক্ষ শ্রমিক মিলে সারাদিনে ৫ টি টুইন বিব কক লাগাতে পারেন, যা বাস্তবসম্মত নয়। আইটেম ডিসক্রিপশনে দেয়াল ফুটো করা ও তা সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করার নির্দেশনা থাকলেও প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত ২১৭৯ টাকার মধ্যে এসবের সংস্থান নেই। সবমিলিয়ে অ্যানালাইসিস আইটেম প্রসঙ্গে বলা যায় ‘অ্যানালাইসিন আইটেমের কি কোনো মা-বাপ আছে ?’
কার স্বার্থে অ্যানালাইসিস আইটেম?
অফিসিয়াল ব্যাখ্যা হলো— কাজের স্বার্থে। আসলেই কি তাই ? না, কখনোই নয়। কিছু ব্যতিক্রম বাদে সিডিউল অব রেটসে একই ধরনের বা কাছাকাছি প্রকৃতির আইটেম আছে, যা দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। কাজ শেষে বা কাজ চলাকালীন ৫০% পর্যন্ত কস্ট ভেরিয়েশনের সুযোগ আছে। সেখানে অ্যানালাইসিস আইটেম দিলে কারও আপত্তির সুযোগ নেই। গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীগণ চাইলে ভাউচারের মাধ্যমেও এ ধরনের আইটেমের বিল পেমেন্ট করতে পারেন; তাদের সেই ক্ষমতা আছে।
এত এত সুযোগ থাকা স্বত্বেও টেন্ডারে অ্যানালাইসিস আইটেম যুক্ত করার প্রয়াসটিই প্রধানত অনৈতিক। ওপেন টেন্ডার মেথডে (ওটিএম) অফিসিয়াল কস্ট এস্টিমেট বা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যই ঠিকাদারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক যেন সোনার হরিণ! অফিসিয়াল এস্টিমেটেড কস্ট-ই হলো ওটিএম টেন্ডারের টিকেট। অথচ অ্যানালাইসিস আইটেম থাকলে ক্যালকুলেশন করে কাজের প্রকৃত মোট মূল্য নিরূপণ করা সম্ভব না, তা তিনি যতই দক্ষ-পেশাদার ঠিকাদার হোন না কেন। এই সুযোগে গড়ে উঠে সিন্ডিকেট এবং চলে অসৎ বাণিজ্য। দাপ্তরিক প্রাক্কলিক মূল্য কিংবা অ্যানালাইসিস আইটেমের রেট সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়। ক্রয়কারী কর্মকর্তা আর টেন্ডার সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষায় অ্যানালাইসিস আইটেম যেন হিরণ্ময় হাতিয়ার!
টেন্ডার সিন্ডিকেট বনাম একজন প্রধান প্রকৌশলী!
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নবনিযুক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম ঘোষণা দিয়েছিলেন – তিনি এই অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি উন্নয়ন করবেন; গণপূর্তে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না; সিন্ডিকেট তিনি রাখবেন না। অ্যানালাইসিস আইটেমের ব্যাপারেও তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। ‘একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অ্যানালাইসিস আইটেম দেওয়া যাবে না এবং অ্যানালাইসিস আইটেম থাকলে দরদাতা ঠিকাদারদের সবাইকেই অফিসিয়াল কস্ট কিংবা অ্যানালাইসিস আইটেমের রেট দিতে হবে’— রংপুর গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালীন এরকম মৌখিক নির্দেশনা তিনি জারি করেছিলেন। রংপুর গণপূর্ত সার্কেলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অধুনা রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) মোঃ আব্দুল গোফফারও তখন নির্বাহী প্রকৌশলীদের একরকম বাধ্য করেছিলেন অ্যানালাইসিস আইটেম ছাড়াই টেন্ডার করতে। এখন অবস্থা আবারও খারাপের দিকেই যাচ্ছে। রংপুর জোনের দিনাজপুর সার্কেলে শুরু থেকেই অ্যানালাইসিস আইটেম দেওয়া হচ্ছে নির্বিচারে। আশঙ্কা করি – গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যান্য সার্কেলেরও একই হাল। সেক্ষেত্রে এক জিকে শামীমকে জেলে রেখে কী হবে ? গণপূর্তের প্রত্যেক ডিভিশনে ২/৪ জন জিকে শামীম থাকবে, সেইসঙ্গে প্রত্যেক জেলায় অন্তত একটি করে সিন্ডিকেট থেকেই যাবে, যদি না অ্যানালাইসিস আইটেম নামের গোলক ধাঁধা টেন্ডার থেকে পুরোপুরি বিদেয় করা হয়।
শুধুমাত্র Registered ব্যবহারকারি গন-ই সব ফিচার দেখতে ও পড়তে পারবেন। একবছরের জন্য Registration করা যাবে। Registration করতে ক্লিক করুন।
সমাধান কোন পথে?
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী চাইলে মাত্র ৭ দিনেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমার মতে সমস্যার সমাধান অনেকগুলো উপায়েই করা যায়। তবে এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
১। সব সার্কেলে সচরাচর অনুমোদিত অ্যানালাইসিস আইটেমগুলো একত্র করলে দেখা যাবে – সারাদেশে ব্যবহৃত অ্যানালাইসিস আইটেমের সংখ্যা ৫৯ টির বেশি নয়। অডিটোরিয়ামের কাজের অকেস্টিক আইটেম, বালিশ, পর্দা মিলিয়েও অ্যানালাইসিস আইটেম ১০০ টি হবে না হয়তো। প্রধান প্রকৌশলী মহোদয় উদ্যোগ নিয়ে এই অ্যানালাইসিস আইটেমগুলোকে রেগুলার আইটেম হিসেবে সিডিউল অব রেটসের অন্তর্ভূক্ত করতে পারেন তাঁর স্বাক্ষরিত দাপ্তরিক আদেশের মাধ্যমে।
২। এছাড়াও, প্রয়োজন হলে অ্যানালাইসিস আইটেমগুলোকে ফিক্সড আইটেম হিসেবে প্রাক্কলনে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাহলে অংশগ্রহনকারী সব দরদাতাই সমান সুযোগ পাবে এবং এটা নিয়ে কাড়াকাড়ির প্রয়োজন হবে না। তাহলেই এহেন অস্বচ্ছতার অবসান ঘটবে।
৩। তারপরও রেটকোড বহির্ভূত আইটেমের প্রয়োজন পড়লে কস্ট ভেরিয়েশন প্রস্তাবেই তা যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী ভাউচারের মাধ্যমে দরপত্র বহির্ভূত অ্যানালাইসিস আইটেমের বিল পরিশোধ করবেন।
৪। অ্যানালাইসিস আইটেমগুলো রেট সিডিউলে রেগুলার হিসেবে অন্তর্ভূক্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োগ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে কেবল প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদনক্রমে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যানালাইসিস আইটেম থাকা এস্টিমেট পাশের ক্ষমতাও কেবল প্রধান প্রকৌশলীরই থাকা উচিত। আসছে ২০২১ সালে সিডিউল অব রেটস এমনভাবে পরিমার্জন-পরিবর্ধন করতে হবে, যাতে তৎপরবর্তীকালে অ্যানালাইসিস আইটেমের আদৌও কোনো প্রয়োজন না থাকে।
৫। সাধারণ ঠিকাদারদের স্বার্থরক্ষায় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত এলটিএমের মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান জরুরি।
টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সর্বজনীন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তি উন্নত হবে না। টেন্ডার সিন্ডিকেট নিপাত যাক! দাপ্তরিক প্রাক্কলনে (estimate) অ্যানালাইসিস আইটেম বন্ধ করার মাধ্যমে ওটিএম টেন্ডারের অসাধু বাণিজ্য বন্ধ হোক। জয় হোক সাধারণ পেশাদার ঠিকাদারদের!
দ্রষ্টব্যঃ মতামতের জন্য সাইটের এডমিন দায়ী নয়।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
2 thoughts on “দাপ্তরিক প্রাক্কলনে (estimate) অ্যানালাইসিস আইটেম বন্ধ করা হোক”
হুম, অ্যানালাইসিস আইটেম দেয়াটা যে ভাওতাবাজী সেটা সবাই বোঝে। আর সমস্যাই বা কিসের! গণপূর্ত যে দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্থ ডিপার্টমেন্ট সেটা সবাই খুব ভালোভাবে জানে।
সাধারণ ঠিকাদারদের স্বার্থরক্ষায় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত এলটিএমের মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান জরুরি।