নিয়ম বহির্ভূত টেন্ডারে আগ্রহী বিএসএমএমইউ’র ক্রয় কমিটি
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) অনুসরণ না করেই ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় লিনিয়ার এক্সিলারেটর (রেডিওথেরাপি মেশিন) কিনতে তৎপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)।
গত সোমবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী ১ অক্টোবর চূড়ান্ত ক্রয় আদেশ দিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জানা গেছে, দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় লিনিয়ার এক্সিলারেটর ক্রয়ের প্রক্রিয়া কয়েকবার পিছিয়েছে। টেন্ডার সংক্রান্ত অনিয়ম প্রসঙ্গে এ পর্যন্ত ৫ বার চিঠি দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি ভুক্তভোগীরা। ২০১৬ সালে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হলেও এ পর্যন্ত দুই বার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় কমিটির দুর্নীতি পরায়ণ একটি গোষ্ঠী এসব করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
আর এ গোষ্ঠীর একগুয়েমির কারণে দুর্ভোগে রয়েছেন দেশের অংসখ্য দরিদ্র ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, লিনিয়ার এক্সিলারেটর কিনতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টেন্ডার আহ্বান করে বিএসএমএমইউ। কিন্তু টেন্ডার মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগের কারণেই জটিলতা শুরু হয়। অনিয়মের বিষয়টি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেসময় বেশ উত্তেজনকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।
তদন্ত কমিটি অনিয়মের অস্তিত্ব পাওয়ায় পূর্বের টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বানের সুপারিশ করে। সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর আবারও টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
সূত্র জানায়, পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করার পর টেন্ডারের সব শর্ত মেনে দেশের মাত্র দুটি কোম্পানি এতে অংশ নিতে সমর্থ হয়। এরমধ্যে একটি কোম্পানি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে দরপত্রে উল্লিখিত শর্ত পূরণে সক্ষম মেশিনের দাম প্রস্তাব করে ২১ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। অপর দিকে অন্য কোম্পানির প্রস্তাবিত দাম ২৬ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা কমে উন্নতমানের টেন্ডারের শর্ত পূরণে সক্ষম মেশিন সরবরাহ করার প্রস্তাব দেয়।
অপেক্ষকৃত কম মূল্যে উন্নতমানের ক্যান্সার চিকিৎসার মেশিন সরবরাহ করায় ক্যান্সার হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্যান্সার চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ওই কোম্পানির কাছ থেকে লিনিয়ার এক্সিলারেটর ক্রয় করে থাকে বলে জানা গেছে। কিন্তু বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে ৪ কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা বেশি দিয়ে লিনিয়ার কিনতে আগ্রহী।
এতে করে অপেক্ষাকৃত স্পল্পমূল্যে মেশিন সরবরাহে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানটি ক্রয় কমিটিকে পিপিআর রুল অনুসারে ক্রয় কমিটিকে ক্লিনিক্যাল ভিজিটের আমন্ত্রণ জানায়।
এমনকি বিগত ৮ জুলাই টেন্ডার কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রধান উপ-উপাচার্য শিক্ষা অধ্যাপক ডা. শাহানা আক্তার রহমান এবং টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. আহমেদ আবু সালেহ বরাবর উল্লেখিত টেন্ডারে অনিয়ম ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এর ধারা-২৯ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল-২০০৮ এর রুল ৫৬ ও ৫৭ সহ অধ্যায়-৩ এর পার্ট-১২ সহ টেন্ডার ডকুমেন্ট এর ধারা ১(৭০) মোতাবেক লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।
অভিযোগের কপি সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রাপ্তিস্বীকারসহ গ্রহণ করে। কিন্তু উল্লেখিত অভিযোগ দায়েরের পরেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনোরূপ ব্যবস্থা না নেওয়ায় কম দাম প্রস্তাবকারী কোম্পনির পক্ষ থেকে একই অভিযোগ গত ১৯ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দুর্নীতি পরায়ণ ব্যক্তি টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি এবং কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটির চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে ৪ কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা বেশি দামে লিনিয়ার কিনতে সম্মত করিয়েছেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর ক্রয় কমিটির সভায় আগামী ১ অক্টোবর বেশি দামে মেশিন সরবরাহ করতে তাদের পচ্ছন্দের কোম্পানিকে ক্রয় আদেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটির চেয়ারম্যান ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা এখন সম্ভব হচ্ছে না। যা হবে তা হলেই সবাই জানতে পারবে।
সামগ্রিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, খুব দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে। আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে। আমাদের তদন্ত চলছে। যদি আগের টেন্ডারের বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সেটা বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার দিয়ে মেশিনটি কেনার কাজ সম্পাদন করা হবে। আর অভিযোগ না থাকলে আগের টেন্ডার অনুসারেই সব হবে।
নিউজটি পড়তে ক্লিক করুন।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা