১০% আইন বাতিল এখন সময়ের দাবী
২০১৬ সালে সরকারি ক্রয় আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেকোনো সরকারি কেনাকাটায় একটি প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর থাকে এবং তা গোপন রাখতে হয়। ক্রয় আইনের ওই সংশোধনী অনুযায়ী, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো কার্য ক্রয়ের (Works) প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারেরা যদি ওই দরের ১০ শতাংশ কম বা বেশির মধ্যে দর না দেন, তাহলে ওই ঠিকাদারকে অযোগ্য বিবেচনা করা হবে, যা দরসীমা বা ‘প্রাইস ক্যাপ’ হিসেবে পরিচিত।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এর ধারা ৩১ এর উপধারা (৩) অনুযায়ি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আভ্যন্তরিন সরকারি কেনাকাটায় কার্যের ক্ষেত্রে কোনো দরদাতা দরপত্রের দাপ্তরিক প্রাক্কলনের ১০ ভাগ কম বা বেশি মূল্য দরপত্রে উল্লেখ করলে দরপত্র বাতিল হয়ে যাবে। এই আইন অবলম্বনে দরপত্র আহবান করায় সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারি এবং ঠিকাদাররা বর্তমানে বিরুপ পরিস্থিতির স্বীকার হচ্ছে।
শুধুমাত্র Registered ব্যবহারকারি গন-ই সব ফিচার দেখতে ও পড়তে পারবেন। এক বছরের জন্য Registration করা যাবে। Registration করতে ক্লিক করুন।
১০% এর কারনে ৯০% সমস্যা
এরুপ পরিস্থিতিতে, এই প্রাক্কলিত ব্যয় অংকটি দরপত্র জমা দেওয়ার সময় অনেক দরদাতার কাছেই আলাউদ্দিনের চেরাগের মতই মূল্যবান হবে বলে আশংকা না করার কোন কারন নাই। এই নিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী দপ্তরগুলো যে অনেক অনৈতিক চাপে থাকবে তা অমূলক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এখন প্রায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দরপত্রে সমদরে দরপত্র দাখিল হতে দেখা যাচ্ছে এবং তা দাপ্তরিক প্রাক্কলনের ১০% কম বা তার সবচেয়ে কাছাকাছি।
বিধি অনুযায়ি একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে আসলে কতজন প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত থাকে ? ক্রয়কারী কর্তৃক নিজ এবং অন্য ক্রয়কারীর প্রতিনিধিসহ ৩ (তিন) জন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রথমে প্রাক্কলন প্রস্তুত করবে। তারপর তা অনুমোদনকারী (বা প্রয়োজ্য) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদন করবেন। সুতরাং শুধুমাত্র ব্যক্তি হিসেবেই অন্তত ৪ জন এই প্রাক্কলন প্রস্তুতির সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে এবং বিধি অনুযায়ি জড়িত। এখন, অনুমোদনকারীর কাছে এই প্রাক্কলন বাস্তবে পাঠাবেন আসলে সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী। আর অনুমোদনকারী (বা প্রয়োজ্য) কর্তৃপক্ষ অনুমোদনের পূর্বে সাধারনত যাচাই-বাছাই করবেন এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য তার নিশ্চই নিজস্ব ব্যবস্থাপনা থাকবে। কাজেই পরোক্ষভাবে আরো বেশি জনবলের এর সাথে সম্পৃক্ত হবার আশংকা নিশ্চিত। এখন এরকম অবস্থায় প্রাক্কলিত ব্যয় গোপন থাকবে তার ১০০% গ্যারান্টি আছে কি ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ এর বিধি ১৬ এর উপ-বিধি (৫ক) অনুযায়ি ৩ (তিন) জন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা প্রস্তুতকৃত দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় এবং উপ-বিধি (৫খ) অনুযায়ি যথাযত অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করার সামগ্রিক প্রক্রিয়ার মাঝে প্রাক্কলিত মূল্য কতক্ষন গোপন থাকবে তা যারা এই বিধিটি সংশোধন করে যোগ করেছেন তারা না বুঝলেও মাঠ পর্যায়ে যারা সত্যিকার অর্থে এর সাথে সম্পৃক্ত তারা হাড়ে হাড়ে তা উপলন্ধি করছেন।
ই-জিপি এর ক্ষেত্রে বিষটি আরো সাংঘর্ষিক। ই-জিপি সিস্টেমে ক্রয়কারীকে দরপত্র আহবানের পূর্বে অবশ্যই দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য উল্লেখ করতে হয়, তাহলে অনুমোদনের পর দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় সীলগালা করার যৌক্তিকতা থাকে না। সুতরাং, বোঝা গেল যে দাপ্তরিক প্রাক্কলন নিয়ে গন্ডগোল থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আসলে যা করার করতে হবে। না হলে যত যুৎসই আইন বা পলিসি বানানো হোক না কেন তা আদতে কাজ করবে না।

উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় দরসীমা ঠিক করায় সরকারি কেনাকাটায় নানা সমস্যা হচ্ছে। এতে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা কমেছে, বড় ঠিকাদারেরা বেশি কাজ পাচ্ছেন। সম্প্রতি সরকারি কেনাকাটা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এই প্রাইস ক্যাপের বিষয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর একটি গোপনীয় বিষয়। কিন্তু উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রাইস ক্যাপ দেওয়ায় প্রকৃত সর্বনিম্ন দরদাতা বাতিল হয়ে যেতে পারেন। আর দাপ্তরিক দর নির্ধারণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা