ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স লঃ প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনালদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
আগে প্রকিউরমেন্ট বা কেনাকাটার মূল মন্ত্র ছিল – “সস্তায় এবং দ্রুততম সময়ে পণ্য আনা”। কিন্তু ২০২৪ সালের পরে এই সমীকরণটি পাল্টে গেছে। এখন সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ – “পরিবেশবান্ধব, মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এবং টেকসইভাবে (Sustainable) পণ্য আনা”।
২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) Corporate Sustainability Due Diligence Directive (CSDDD) নামক একটি ঐতিহাসিক আইন পাস করেছে। এই আইনটি শুধুমাত্র ইউরোপের কোম্পানিগুলোর জন্য নয়; বরং বাংলাদেশ, চীন, ভারত বা যেকোনো দেশ থেকে ইউরোপে পণ্য রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। আজকের লেখায় আমরা জানার চেষ্টা করব, এই CSDDD আসলে কী এবং কেন এটি প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনালদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
EU CSDDD কী?
সহজ কথায়, Corporate Sustainability Due Diligence Directive (CSDDD) হলো এমন একটি আইনি কাঠামো, যা বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করবে তাদের নিজস্ব কার্যকলাপ এবং তাদের সাপ্লাই চেইনের (Supply Chain) ওপর মানবাধিকার ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে।
২০২৪ সালের শুরুতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং কাউন্সিল এই আইনের ওপর চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
স্কোপ: ইইউ ভিত্তিক বড় কোম্পানি এবং ইইউ-এর বাইরের এমন কোম্পানি যারা ইইউ-তে বড় পরিসরে ব্যবসা করে (যেমন: বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান)।
দায়িত্ব: কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই তাদের সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে (শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) ঝুঁকি বা রিস্ক চিহ্নিত করতে হবে।
জরিমানা: যদি কোনো কোম্পানি এই আইন মানে না, তবে তাদের বৈশ্বিক টার্নওভারের ৫% পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
বাংলাদেশ এবং প্রকিউরমেন্টের ওপর প্রভাব
বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাতে। এই আইন চালু হলে ইউরোপিয়ান বায়াররা তাদের সাপ্লাই চেইনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি কারখানাগুলো থেকে আরও কঠোর কমপ্লায়েন্স আশা করবে। এটি সরাসরি প্রকিউরমেন্ট প্রসেসকে প্রভাবিত করবে।
প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনালদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
EU CSDDD শুধুমাত্র একটি আইন নয়; এটি প্রকিউরমেন্টের ভবিষ্যৎ দিগন্ত। এখান থেকে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া উচিত:
১. “Compliance” এখন কেনার শর্ত (Compliance is Non-Negotiable)
এখন থেকে সাপ্লায়ার নির্বাচনের সময় শুধুমাত্র দাম (Price) বা ডেলিভারি টাইম দেখলে চলবে না। প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনালদের খেয়াল রাখতে হবে সাপ্লায়ার কি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দিচ্ছে? তারা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ করছে কি না। আইনগত কমপ্লায়েন্স ছাড়া কোনো সোর্সিং আর নিরাপদ নয়।
২. সাপ্লাই চেইন ট্রান্সপারেন্সি বা স্বচ্ছতা (Transparency)
আগে প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজাররা প্রায়ই তাদের সাপ্লাই চেইনের গভীরে যেতেন না। কিন্তু CSDDD অনুযায়ী, আপনাকে জানতে হবে আপনার পণ্যের কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে। যেমন—গার্মেন্টসের সুতি কাপড়ের তুলা কোন খামার থেকে এসেছে, সেখানে শিশু শ্রম ব্যবহার হচ্ছে কি না। সুতরাং, Supply Chain Mapping এখন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ছে।
৩. কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস করা (Decarbonization)
এই আইন পরিবেশগত ক্ষতি রোধে জোর দেয়। প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনালদের এখন এমন সাপ্লায়ার নির্বাচন করতে হবে, যারা গ্রিন এনার্জি ব্যবহার করে এবং কার্বন নিঃসরণ কমায়। ভবিষ্যতে Green Procurement বা পরিবেশবান্ধব কেনাকাটা ছাড়া ইউরোপে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
৪. ডকুমেন্টেশন এবং প্রমাণের গুরুত্ব
মৌখিক আশ্বাস আর কাজ করবে না। প্রতিটি ধাপের জন্য নথিপত্র (Documentation) এবং ডেটা প্রমাণ রাখতে হবে। প্রকিউরমেন্ট দলকে নিশ্চিত করতে হবে যে, সাপ্লায়ারদের সার্টিফিকেশন (যেমন: LEED, ISO 14001) আপডেট আছে কি না।
৫. সাপ্লায়ারদের সক্ষমতা বাড়ানো (Capacity Building)
অনেক ছোট সাপ্লায়ার এই আইন বুঝতে পারবে না এবং কমপ্লায়েন্স করতে পারবে না। একজন দক্ষ প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনাল হিসেবে আপনার দায়িত্ব হবে তাদের শিক্ষিত করা এবং কমপ্লায়েন্স অর্জনে সহায়তা করা। এটি দীর্ঘমেয়াদে আপনার সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করবে।
উপসংহার
EU CSDDD একটি চ্যালেঞ্জ, কিন্তু একই সাথে এটি একটি সুযোগ। যে প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই টেকসই প্রকিউরমেন্ট (Sustainable Procurement) ব্যবস্থায় পদক্ষেপ নেবে, তারা ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
প্রকিউরমেন্ট আর শুধুমাত্র খরচ সাশ্রয় নয়; এটি এখন ব্যবসার ঝুঁকি ম্যানেজ করা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করা। বাংলাদেশের প্রকিউরমেন্ট সেক্টরকে এখন থেকেই এই নতুন বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
সোর্স এবং রেফারেন্স:
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট দিয়ে কি Service ক্রয় করা যাবে ?
সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বারবার দরপত্র আহ্বানের প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা নিরসন এবং উন্নততর ক্রয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট (Framework Agreement)’

নতুন একনেক এবং CCGP কমিটি গঠন
নতুন সরকার আসার পর নতুন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক – ECNEC) এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি

Works চুক্তিতে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে পিপিআর ২০২৫ এ কি আছে ?
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গত ৪ঠা মে ২০২৫ ইং তারিখে “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” এবং ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ইং তারিখে

European Industrial Law: A master plan to build ‘Made in Europe’ with a procurement power of €2 Trillion
The forthcoming Industrial Accelerator Act, slated for publication on February 26, marks a watershed moment in the European Union’s pursuit