ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন ফিঃ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পরামর্শকদের মধ্যকার বৈষম্য
বর্তমানে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) পোর্টালে জাতীয় ব্যক্তিগত পরামর্শকদের (Individual Consultant) জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৫,০০০ টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ২,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উচ্চ ফি পদ্ধতিটি বর্তমানে বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হচ্ছে, যা ব্যক্তিগত পরামর্শকদের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আরও দেখুনঃ e-GP পোর্টালে Individual Consultant-দের রেজিষ্ট্রেশন
সমালোচনা
নীতিগত অসামঞ্জস্য ও বৈষম্য: একজন Individual Consultant মূলত একজন ব্যক্তি হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু তাকে একটি কোম্পানির সমান হারে ৫,০০০ টাকা ফি প্রদান করতে হচ্ছে যা অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং বৈষম্যমূলক।
বড় কোম্পানি বা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫,০০০ টাকা খুব সামান্য, কিন্তু একজন ব্যক্তির আয়ের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য। এমনকি রেজিস্ট্রেশন করে কেউ যদি সারা বছর একটিও কাজ না পান, তবুও তাকে পরের বছর ২,০০০ টাকা নবায়ন ফি দিতে হয়। এটি অনেককেই নিরুৎসাহিত করবে।
তরুণ পেশাজীবীদের জন্য বাধা: নতুন গ্র্যাজুয়েট, ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্ট, নতুন বা উদীয়মান পরামর্শক এবং গবেষকদের জন্য এই ৫,০০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি একটি বড় বেশ অঙ্ক এবং আর্থিক বাধা। অনেক দক্ষ ব্যক্তি (যেমন: প্রকৌশলী, আর্কিটেক্ট, এফসিএ) যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং বা একক প্রয়াসে কাজ করতে চান, তাঁদের জন্য কাজ পাওয়ার আগেই এই টাকা বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। এটি সরকারি কাজের বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে।
অনেক দক্ষ ব্যক্তি (যেমন: প্রকৌশলী, আর্কিটেক্ট, এফসিএ) যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং বা একক প্রয়াসে কাজ করতে চান, তাঁদের জন্য কাজ পাওয়ার আগেই এই টাকা বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। এটি সরকারি কাজের বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে।
ডিজিটাল সিস্টেমের ব্যয়ের ন্যায্যতা: e-GP একটি অনলাইন স্বয়ংক্রিয় এবং কাগজবিহীন ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রেশনে এত উচ্চ ফি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, সিস্টেমের সার্ভার ও মেইনটেন্যান্স খরচ সরকারি বাজেট থেকেই বহন করা সম্ভব।
ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা হলো সবাইকে প্রযুক্তির মূলধারায় আনা। কিন্তু উচ্চ ফি এই প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র ধনী বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের জন্য সীমাবদ্ধ করে, যা সাধারণ ব্যক্তির জন্য প্রবেশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চর্চার পরিপন্থী: বিশ্বের অনেক দেশে ব্যক্তিগত পরামর্শকদের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ফ্রি বা নামমাত্র রাখা হয়। বাংলাদেশে কোম্পানি ও ব্যক্তির জন্য প্রায় একই ফি নির্ধারণ করাকে ‘Pro-People Procurement’ নীতির সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে।
এভাবে, উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফি-র কারণে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নতুনদের প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং বাজারে কেবল অভিজ্ঞদের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হচ্ছে।
উত্তরণের সুপারিশমালা
এই সমস্যা সমাধানে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
১. ব্যক্তিগত পরামর্শকদের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি কমিয়ে ১,০০০ টাকা করা।
২. নতুন কনসালট্যান্টদের উৎসাহিত করতে প্রথমবার ফ্রি রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ প্রদান করা।
৩. শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা।
৪. নারী ও প্রতিবন্ধী কনসালট্যান্টদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা।
পরিশেষ
প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এই ফি সরকারের বিশাল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি রক্ষণাবেক্ষণ, সার্ভার খরচ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজন। এছাড়া, অগুরুত্বপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের রেজিস্ট্রেশন থেকে নিরুৎসাহিত করার জন্যও এই ফি আরোপ করা হতে পারে, যাতে কেবল আগ্রহী ও প্রকৃত পরামর্শকরা রেজিস্টার করে। তদুপরি, e-GP সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া প্রযুক্তিগতভাবে সহজ হলেও উচ্চ ফি ব্যক্তিগত পরামর্শকদের জন্য একটি বড় অন্তরায়।
সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফি আদায় করা প্রয়োজন হলেও, ব্যক্তিভিত্তিত পরামর্শকদের জন্য এই ফি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। সরকার যদি কম সময়ের জন্য (যেমন: ৩ বা ৫ বছরের জন্য এককালীন) রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো বা নতুন রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেন, তবে আরও বেশি সংখ্যক দক্ষ পরামর্শক এই প্ল্যাটফর্মে আসবেন, যা সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং উন্নত সেবা পেতে সহায়ক হবে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Balancing Discretion and Equal Treatment: Insights from the CJEU’s Landmark Ruling
In 2026, the Court of Justice of the European Union (CJEU) delivered a landmark ruling in Case C-590/24 AK Dlhopolec

Procurement-এ flexibility আছে, কিন্তু তা সীমাহীন নয়ঃ ইউরোপের সর্বোচ্চ আদালত
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনে ২০২৬ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলোর একটি হলো Case C-590/24 AK Dlhopolec and Others। এই মামলাটি

১টি ৩৫ কোটি টাকার রাস্তার কাজ যা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছিল। এখন, কাজ চলাকালীন ভেরিয়েশন লাগবে। কিছু আইটেমের কাজ কমে যাওয়ায় ৩৫ কোটি টাকার মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করা যাবে। সমস্যা হলো, ৫টি Non-Tender আইটেম লাগবে যা সব মিলে ৩.৫ কোটি টাকার। এখন, এক্ষেত্রে কি ভেরিয়েশন লাগবে ? কে অনুমোদন দিবে, মন্ত্রণালয় নাকি HOPE ?
চুক্তি সম্পাদনের পর হতে উক্ত চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন বা বাতিল পর্যন্ত সময়ে প্রশাসনিক, আর্থিক, ব্যবস্থাপনাগত ও কারিগরী কারনে চুক্তির ভেরিয়েশন

রেডিও Talk: আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট দিবস
বিস্তারিত দেখুনঃ আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট দিবস