EU তে IPI কার্যকরঃ চীনা মেডিকেল ডিভাইস সরবরাহকারীদের উপর নিষেধাজ্ঞা
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) বিশ্বব্যাপী সরকারি ক্রয়ে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে International Procurement Instrument (IPI) নামে একটি নতুন আইনি কাঠামো প্রস্তুত করেছে। এই IPI হলো (EU) 2022/1031 রেগুলেশনের অধীনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কর্তৃক গৃহীত একটি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, যা ইইউকে এমন অ-ইইউ দেশগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে দেয় যারা তাদের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বাজারে ইইউ সরবরাহকারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে। এই ব্যবস্থাটি মূলত একটি “পারস্পরিকতা প্রক্রিয়া” বা reciprocity mechanism হিসেবে কাজ করবে।
International Procurement Instrument (IPI) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় কমিশন চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি মূল্যের চিকিৎসা যন্ত্রপাতির জন্য ইইউ-এর পাবলিক প্রকিউরমেন্ট থেকে চীনা সংস্থাগুলিকে বাদ দেওয়া।
প্রথম পদক্ষেপের বিস্তারিত:
- কার্যকরীর তারিখ ও কর্তৃপক্ষ: ২০২৫ সালের ১৯শে জুন ইউরোপীয় কমিশন IPI এর অধীনে প্রথম একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
- লক্ষ্য: এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীনা কোম্পানিগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মেডিকেল ডিভাইস ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
- চুক্তির মূল্য: এই নিষেধাজ্ঞা ৫ মিলিয়ন ইউরো বা তার বেশি মূল্যের চুক্তিগুলোর জন্য প্রযোজ্য।
- নিষেধাজ্ঞার সময়কাল: এই নিষেধাজ্ঞা ৫ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।
- নিয়মাবলী: এই সিদ্ধান্তটি কমিশন ইমপ্লিমেন্টিং রেগুলেশন 2025/1197, ১৯ জুন ২০২৫ -এর অধীনে গৃহীত হয়েছে।
IPI প্রবর্তনের কারণ এবং প্রেক্ষাপট:
IPI প্রবর্তনের প্রধান কারণ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্মুক্ত ক্রয় বাজারের (যার বার্ষিক মূল্য প্রায় €2 ট্রিলিয়ন) বিপরীতে চীন সহ অনেক বাণিজ্য অংশীদারদের দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতা। ইইউ-এর এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ইইউ সংস্থাগুলির জন্য একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরি করা এবং চীনকে ইইউ সংস্থা এবং ইইউ-নির্মিত চিকিৎসা সরঞ্জামের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে উৎসাহিত করা।
IPI কীভাবে কাজ করে (এই ক্ষেত্রে):
IPI সাধারণত তিনটি প্রধান ধাপে কাজ করে: তদন্ত, পরামর্শ ও সংলাপ, এবং যদি সমাধান না হয় তবে সীমাবদ্ধতামূলক ব্যবস্থা।
এই বিষয়টি নিয়ে ইইউ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি তদন্ত চালিয়েছিল। ইউরোপিয়ান কমিশনের জানুয়ারি ২০২৫ সালের তদন্ত (IPI তদন্ত) অনুযায়ী, চীনের সরকারি ক্রয় (public procurement) প্রক্রিয়ায় EU মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কয়েকটি বৈষম্যমূলক আচরণ শনাক্ত করা হয়। মূল বৈষম্যগুলো হলো –
- চীনের সরকারি ক্রয়ে বিদেশি মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানিদের জন্য বাজারে প্রবেশাধিকার প্রায় পুরোপুরি বন্ধ বা সীমিত। স্থানীয় কোম্পানিগুলো “Buy Chinese” নীতি ও দেশীয় অগ্রাধিকার পায়, ফলে EU সরবরাহকারীরা সরকারি টেন্ডারে অংশ নিতে পারে না।
- EU কোম্পানিগুলোকে সরকারি টেন্ডারে যোগ্য হওয়ার জন্য চীনের ভেতরে উৎপাদন কারখানা স্থাপন করতে বা যৌথ উদ্যোগে (JV) প্রবেশ করতে বাধ্য করা হয়। অর্থাৎ, বিদেশি কোম্পানিকে স্থানীয় অংশীদারের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়, যা তাদের প্রতিযোগিতামূলক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- অনেক সরকারি দরপত্রে এমন প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন বা মান (standards) ব্যবহার করা হয়, যা শুধুমাত্র দেশীয় পণ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু আন্তর্জাতিক বা ইউরোপীয় মান অনুসারে তৈরি ডিভাইসগুলো বাদ পড়ে যায়।
- EU মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানিদের রেজিস্ট্রেশন, অনুমোদন (licensing) ও regulatory clearance প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ, জটিল এবং ব্যয়বহুল করা হয়েছে, যাতে তারা প্রতিযোগিতা করতে না পারে। অথচ একই ধরনের প্রক্রিয়ায় দেশীয় কোম্পানিগুলো সহজে অনুমোদন পায়।
- দরপত্রে অস্বচ্ছ মূল্যায়ন মানদণ্ড ব্যবহার করা হয় এবং অনেক সময় EU কোম্পানির প্রস্তাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়, যেখানে দেশীয় কোম্পানিগুলো সরাসরি চুক্তি পায়।
এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো কার্যত চীনের সরকারি মেডিকেল ডিভাইস বাজার থেকে বাদ পড়ে যায়, যদিও চীনা কোম্পানিগুলো স্বাধীনভাবে EU-এর উন্মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারছে।
এটিকে reciprocity imbalance বলা হয়, আর সেই কারণেই EU International Procurement Instrument (IPI) ব্যবহার করে চীনা মেডিকেল ডিভাইস সরবরাহকারীদের ৫ বছরের জন্য (৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি মূল্যের চুক্তিতে) EU বাজার থেকে ডিবার করেছে।
তাৎপর্য এবং প্রভাব:
ইইউ-এর এই পদক্ষেপটি একটি ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছে, যা প্রমাণ করে যে IPI কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি বাস্তব প্রয়োগকারী প্রক্রিয়া। এই ব্যবস্থা ইইউ কোম্পানিগুলোর জন্য বৈশ্বিক ক্রয় সুযোগে ভালো প্রবেশাধিকার এবং অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। তৃতীয় দেশগুলির জন্য এটি তাদের বাজার উন্মুক্ত করতে এবং ন্যায্য বাণিজ্যে জড়িত হতে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বব্যাপী পাবলিক প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে, IPI পারস্পরিক সম্পর্ক-ভিত্তিক ক্রয় ব্যবস্থার দিকে একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বাজারে প্রবেশাধিকার ন্যায্যতা এবং উন্মুক্ততা শর্তযুক্ত হবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য, এর অর্থ হলো ইইউ ক্রয় বাজারে প্রবেশাধিকার আর শর্তহীন থাকবে না; তাদের নিজস্ব সিস্টেমে বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার প্রদর্শন করতে হবে।
উপসংহার:
International Procurement Instrument (IPI) হলো একটি যুগান্তকারী উপকরণ যা বিশ্বব্যাপী ক্রয়ের গতিশীলতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। বাজার প্রবেশাধিকারকে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ন্যায্যতার সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ইইউ তার ক্রয় প্রক্রিয়াকে একটি কৌশলগত বাণিজ্য সম্পর্কে উন্নীত করেছে।
বিস্তারিত দেখুনঃ The IPI: A New Era in Fair Global Public Procurement
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা