বিদেশি ঋণ ব্যবহারে কঠোর সরকার: প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন শর্ত
বাংলাদেশ সরকার বিদেশি ঋণ এবং সহায়তা ব্যবহারে ঐতিহাসিক ধীরগতির কারণে নতুন বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর জন্য কঠোর পূর্বশর্ত আরোপ করেছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব কমানো এবং প্রস্তুতিমূলক কাজের মান উন্নত করা। বিদেশি অর্থায়নে প্রকল্পের ঋণচুক্তি সই করার আগে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে মর্মে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি সহায়তা পাইপলাইনে জমা আছে, কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে এর মাত্র ১৩.৫৭ শতাংশ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অংশে ব্যয় হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ ও চ্যালেঞ্জসমূহ বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো সাধারণত পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা করা হলেও, বছরে ন্যূনতম ২০ শতাংশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারে না। এই ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত কমিটমেন্ট চার্জ দিতে বাধ্য হয় এবং প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর একটি নথি অনুযায়ী, প্রকল্প বিলম্বের প্রধান কারণগুলো হলো:
- প্রকল্প প্রস্তুতিতে আর্থিক ও মানবসম্পদ ঘাটতি।
- প্রকল্প ও দরপত্র সংক্রান্ত নথির জটিল ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া।
- জমি অধিগ্রহণে জটিলতা।
- বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সম্পাদনকারী সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
- দুর্বল প্রকল্প প্রস্তুতি।
এডিবি আরও উল্লেখ করেছে যে, ক্রয় প্রক্রিয়াতেও সমস্যা রয়েছে, যেমন:
- পর্যাপ্ত প্রকল্প প্রস্তুতি না থাকা।
- নিম্নমানের ডিজাইন।
- প্রকৌশল খরচের প্রাক্কলন বাজারমূল্যের সঙ্গে মিল না থাকা।
- দুর্বল দরপত্র নথি।
নতুন শর্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- জমি অধিগ্রহণ: প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ জমি অধিগ্রহণ শেষ করতে হবে।
- পুনর্বাসন পরিকল্পনা: জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য একটি পুনর্বাসন পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।
- উপাদানভিত্তিক খরচের হিসাব: প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে উপাদানভিত্তিক খরচের বিস্তারিত হিসাব প্রস্তুত করতে হবে।
- দরপত্রের খসড়া চূড়ান্ত করা এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা: দরপত্রের খসড়া জমা দিতে হবে এবং দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে চুক্তি সই পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ঋণচুক্তি সইয়ের আগেই শেষ করতে হবে।
- অর্থ বিভাগের অনুমোদন: ঋণচুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পাদিত উপ-চুক্তির শর্তাগুলোর জন্য অর্থ বিভাগ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
- ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য স্পষ্ট চুক্তি: নির্মাণকাজের সময় যেসব ইউটিলিটি বা স্থাপনা স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সময়সীমা সম্পর্কিত স্পষ্ট চুক্তি থাকা বাধ্যতামূলক।
নতুন এই কঠোর শর্তাবলী আরোপের মাধ্যমে সরকার বিদেশি ঋণ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্ব জনিত আর্থিক ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করছে। এই পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিদেশি সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিস্তারিতঃ নতুন বিদেশি ঋণ নিতে সরকারি সংস্থাকে মানতে হবে যেসব শর্ত
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও প্রক্রিয়া সহজীকরণে পরিকল্পনা বিভাগের উদ্যোগ
সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সরকার “সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন

কনসালট্যান্টের প্রাথমিক চুক্তি ১৮ মাসের। একবার সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন আবারও ১০০% সময় বৃদ্ধি লাগবে। করা যাবে কি না ? PPR-০৮ নাকি ২৫ অনুসরণ হবে ?
উন্নয়ন প্রকল্পে ৩ লাখ টাকা বেতনে পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী একজন কনসালট্যান্টের ১৮ মাসের জন্য ৫৪ লক্ষ টাকার প্রাথমিক চুক্তি ছিল।

মন্ত্রীদের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতায় লাগামঃ নতুন বার্তা
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এতদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা স্ব-শাসিত সংস্থা

আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬ জারীঃ সরকারি ক্রয় ও ব্যয় প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো পরিবর্তন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০১৫’ বাতিল