ইউনিয়ন পরিষদে এখনো চালু হয়নি ই-জিপি
স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে কীভাবে ?
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ (Union Parishad)। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় সেবা প্রদান এবং বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলো অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে—
দেশের কোথাও এখনো ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) চালু হয়নি।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে যেখানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সংস্থায় ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখানে ইউনিয়ন পরিষদগুলো এখনো মূলত প্রচলিত পদ্ধতিতে ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ইউনিয়ন পরিষদ: স্থানীয় উন্নয়নের মূল কেন্দ্র
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪,৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইউনিয়ন পরিষদগুলো সাধারণত যেসব খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে—
- গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা
- কৃষি উন্নয়ন
- পানি ও স্যানিটেশন
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
- সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ পায়।
ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নের উৎস
ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন সাধারণত নিম্নোক্ত উৎস থেকে আসে—
সরকারি অনুদান ও স্কিম
- বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP)
- বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প
- বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের স্কিম
নিজস্ব রাজস্ব
- হোল্ডিং ট্যাক্স
- ট্রেড লাইসেন্স
- বাজার ও ঘাটের ইজারা
সম্পত্তি হস্তান্তর করের অংশ
বাংলাদেশে ভূমি নিবন্ধনের সময় ধার্যকৃত করের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে প্রদান করা হয়, যা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস।
হাট-বাজার ইজারা আয়
“সরকারি হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১১” অনুযায়ী হাট-বাজার ইজারা আয়ের একটি অংশ ইউনিয়ন পরিষদকে প্রদান করা হয়।
কিন্তু ক্রয় প্রক্রিয়া এখনো অফলাইনে
যদিও ইউনিয়ন পরিষদগুলো প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তবুও এসব প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম এখনো মূলত ম্যানুয়াল বা প্রচলিত দরপত্র পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়।
এর ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখা দিতে পারে—
- দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়া
- তথ্যপ্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধতা
- স্বচ্ছতার ঘাটতি
- অভিযোগ ও অনিয়মের সম্ভাবনা
- তদারকি দুর্বল হওয়া
অন্যদিকে, সরকারি বেশিরভাগ সংস্থাই ইতোমধ্যে ই-জিপি ব্যবস্থায় সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে।
ই-জিপি: সরকারি ক্রয়ে ডিজিটাল স্বচ্ছতা
বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে—
✔ অনলাইনে দরপত্র আহ্বান করা যায়
✔ ঠিকাদাররা যেকোনো স্থান থেকে দরপত্র জমা দিতে পারেন
✔ দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ডিজিটালি রেকর্ড থাকে
✔ স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়
বর্তমানে অনেক সরকারি সংস্থা তাদের ক্রয় কার্যক্রম ১০০% ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে পরিচালনা করছে।
ইউনিয়ন পরিষদে ই-জিপি বাস্তবায়ন কেন জরুরি
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ই-জিপি চালু করা হলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুফল পাওয়া যেতে পারে—
স্বচ্ছতা বৃদ্ধিঃ সব দরপত্র অনলাইনে প্রকাশিত হলে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হবে।
প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিঃ দেশের যেকোনো ঠিকাদার অংশ নিতে পারবেন।
দুর্নীতির ঝুঁকি কমবেঃ ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ কমে যাওয়ায় অনিয়মের সুযোগ কমবে।
তদারকি সহজ হবেঃ কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ক্রয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণঃ ডিজিটাল ডেটা ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
ইউনিয়ন পরিষদে ই-জিপি চালুর ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
- প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
- প্রশিক্ষণের অভাব
- ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা
- প্রশাসনিক প্রস্তুতির অভাব
তবে ধাপে ধাপে সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
নীতিগতভাবে কী করা যেতে পারে
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নীতিমালার দৃষ্টিকোণ থেকে ইউনিয়ন পরিষদে ই-জিপি চালুর জন্য কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে—
- নির্বাচিত কিছু ইউনিয়ন পরিষদে পাইলট প্রকল্প চালু করা
- স্থানীয় সরকার কর্মকর্তাদের ই-জিপি প্রশিক্ষণ প্রদান
- ছোট প্রকল্পের জন্য সহজীকৃত ই-জিপি মডিউল তৈরি করা
- পর্যায়ক্রমে সব ইউনিয়ন পরিষদকে ই-জিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা
- পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদে ই-জিপি চালুতে এলজিইডির ভূমিকা ছিল। এখানেই এলজিইডিকে সারা বাংলাদেশের সব ইউনিয়ন পরিষদকে সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।
উপসংহার
গ্রামীণ উন্নয়নের একটি বড় অংশ ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। ফলে এই পর্যায়ের ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ই-জিপি ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও ধীরে ধীরে ই-জিপি চালু করা গেলে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

১ম সংসদ অধিবেশনঃ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ
আজ শুরু হচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই অধিবেশনকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের

বিপিপিএ’র সিদ্ধান্তঃ Individual Consultant দের ই-জিপিতে রেজিস্ট্রেশন ফি লাগবে না
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম Electronic Government Procurement (e-GP)-এ ব্যক্তি পরামর্শকদের (Individual Consultant) জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি বাতিল করা হয়েছে।

পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে e-GP তে আগের মূল্যায়ন প্রতিবেদন কোথায় পাবেন ?
পিপিআর ২০২৫ এর বিধি ৪৭(১) অনুযায়ি অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ (Approving Authority) দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। সিদ্ধান্ত গ্রহনের

Debar এর উপর কোর্টের স্থগিতাদেশ হলে কি করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এর ধারা ৬৪ অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যদি কোনো বিধান লঙ্ঘন করে, তবে তাকে ডিবার (Debar)