বালিশের টেন্ডারে একটি প্যাকেজ ভেঙ্গে একাধিক প্যাকেজ … আইনের লঙ্ঘন নাকি বাস্তবতা !!!
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রিনসিটি প্রকল্পে ২০ ও ১৬ তলা ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা এবং ভবনে উঠানোর কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় এবং সরবরাহ করার জন্য মোট ছয়টি প্যাকেজে ই-জিপি (Electronic Government Procurement) প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দরপত্র আহবান করা হয়েছিল। এখানে অস্বাভাবিক ব্যয়ের পাশাপাশি আরেকটি অভিযোগ হল দরপত্রের অনুমোদন যেন মন্ত্রণালয়ে না যায় সে জন্য প্যাকেজ ভেঙ্গে ছোট করা হয়েছে। ফলে অধিদপ্তর নিজেরাই তা অনুমোদন করেছে। এখন এই দরপত্রে প্যাকেজ ভেঙ্গে ছোট করায় আইনের ব্যত্যয় কতটুকু ? আর এখানে বাস্তবতাই বা কতটুকু ?
প্যাকেজ যে ভাগ করা হয়েছে তাই বা না জেনে বলা উচিত নয়। এমনও তো হতে পারে এক্ষেত্রে সরবরাহের ধরনই ভিন্ন ভিন্ন। সেক্ষেত্রে একটি প্যাকেজ ভেঙ্গে ছয়টি প্যাকেজ করার অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়ে যাবে। তারপরও অভিযোগের আলোকে ধরেই নিচ্ছি একটি প্যাকেজ ভেঙ্গে ছয়টি প্যাকেজ করা হয়েছিল এবং তার আলোকেই আলোচনা চলুক।
আসুন, দরপত্রের অনুমোদন যেন মন্ত্রণালয়ে না যায় সে জন্য প্যাকেজ ভেঙ্গে ছোট করা হয়েছে এই অভিযোগের আলোকে সরলভাবে দূর্ণীতি হয়েছে বলে চট করেই কোনপ্রকার সিদ্ধান্তে না এসে এর আইনগত, প্রক্রিয়াগত, সাধারন practice এবং কিছুটা Academic discussion উপর ভিত্তি করে দেখা যাক আসলে ঘটনাটার আড়ালে কি কি ঘটতে পারে।
যাদের বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় সম্পর্কে অন্তত নূন্যতম ব্যবহারিক জ্ঞান বা ধারনা আছে … এই আলোচনা তাদের জন্য এবং তাদের জন্য বোধগম্য করেই প্রস্তুত করা হয়েছে। এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ (PPR-08) কি বলে
PPR-08 এর বিধি ১৭ তে “একক কাজকে একাধিক প্যাকেজে বিভক্তকরণ” বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। এখানে প্রয়োজনীয় অংশটুকু উল্লেখ করা হলো।
PPR-08 (বিধি ১৭): একক কাজকে একাধিক প্যাকেজে বিভক্তকরণ
(১) ক্রয়কারী উহার ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় কোন নির্দিষ্ট ক্রয় পদ্ধতি বা ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা পরিহারের উদ্দেশ্যে, সাধারণতঃ একটি প্রকল্প বা কর্মসূচীর কোন অংশ নিন্মতর মূল্যমানের একাধিক প্যাকেজে বিভক্ত করিবে না।
(৩) ক্রয়কারী কোন একক কাজ ক্ষুদ্রতর একাধিক প্যাকেজে বা প্যাকেজকে একাধিক ক্ষুদ্রতর লটে বিভক্ত করিবার সময় নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলি বিবেচনা করিবে –
(ক) সুপারিশকৃত আকারের প্যাকেজ বা লটের জন্য রেসপন্সিভ দরপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সামর্থ্য; এবং
(খ) সম্ভাব্য কার্য চুক্তির ক্ষেত্রে, উক্ত কার্যের জন্য নির্ধারিত স্থানের ভৌগোলিক অবস্থানের বিবেচনায় উহার বাস্তবায়নজনিত সুবিধা।
(৪) ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান বা তৎকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা, যথোপযুক্ত কারণ থাকা সাপেক্ষে, ক্ষুদ্রাকার প্যাকেজ বা লটে বিভক্তিকরণ অনুমোদন করিবেন।
(৫) উপ-বিধি (১), (২) ও (৩) এর অধীন কোন একক ক্রয়কার্য একাধিক প্যাকেজে বা কোন প্যাকেজ একাধিক লটে বিভক্ত করা হইলে, উহার কোন একটি প্যাকেজ বা লটের জন্য চুক্তি সম্পাদনের নোটিশ প্রদানের পূর্বে, প্যাকেজসমূহ বা লটসমূহের মোট মূল্যের সমষ্টি যে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের এখতিয়ারভুক্ত সেই কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিটি প্যাকেজ বা লটের দরপত্র অনুমোদনের জন্য পেশ করিতে হইবে।
আলোচনাঃ
সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ি বাৎসরিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রস্তুত করবেন সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারি। তিনি তা প্রস্তুত করার সময় প্যাকেজ, লট, ক্রয় পদ্ধতি, estimate ইত্যাদি প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য ক্রয়কারি দপ্তরের প্রধানের কাছে প্রেরণ করবেন। কাজেই প্যাকেজ প্রস্তুত করেন ক্রয়কারি আর তা অনুমোদন দেন তার অধিদপ্তরের প্রধান। এই প্যাকেজকে বিভাজন করায় কি কি অনুঘটক কাজ করতে পারে এবার তাই দেখা যাকঃ
১। পিপিআর-০৮ এর বিধি ১৭ অনুযায়ি সাধারন অর্থে ক্রয়কারি একটি কাজকে একাধিক প্যাকেজে বা লটে বিভক্ত করবেন না। তবে যথোপযুক্ত কারনে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান বা তৎকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তার অনুমোদন নিয়ে প্যাকেজ বা লটে ভাগ করা যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পণ্য সামগ্রি ক্রয়ে একই রকম সবরবাহের কাজ কে ছয়টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে (অভিযোগ অনুসারে)। এখন, এরূপ ভাগের কারণ খতিয়ে দেখতে হবে। এটা উদ্দেশ্য প্রনোদিত কিনা তা দেখতে হবে। নাকি এটাই সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের স্বাভাবিক প্রাকটিস ?
২। লটে বিভক্ত করে ই-জিপিতে দরপত্র আহবান করা যায় না। আলোচ্য দরপত্রগুলো যেহেতু ই-জিপি প্লাটফর্ম ব্যবহার করে আহবান করা হয়েছিল কাজেই এখানে লট-বাই-লট হিসেবে দরপত্র আহবানের সুযোগই ছিল না।
৩। একটি কাজকে একাধিক প্যাকেজ বা লটে বিভক্ত করলেও পিপিআর-০৮ এর বিধি ১৭(৫) এর আলোকে সমষ্টিক মূল্যের উপর অনুমোদন নেয়ার ক্ষেত্রে ধারনা ও ব্যাক্ষা পরিষ্কার না থাকায় এবং সাম্ভাব্য সময় বাঁচানোর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা সরকারি দপ্তরগুলো সাধারনত এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার। যদি অন্যান্য ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই বিধি অনুসরিত না হয়ে থাকে তবে শুধু ক্রয়কারি একা দায়ী হতে পারেন না।
৪। রেসপন্সিভ দরপত্র দাখিল, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সামর্থ্য, ইত্যাদি বিবেচনা করেও প্যাকেজ ভাগ করা হয়েছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
৫। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এড়ানোর জন্য একটি প্যাকেজ ভেঙ্গে একাধিক প্যাকেজ করা হয়ে থাকলেও থাকতে পারে। যে সব ক্ষেত্রে দরপত্রের অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয় সেসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দরপত্রের অনুমোদন হতে কত দিন লাগে, কেন লাগে, কতবার খোঁজ নিতে হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা দরকার। কারন যদি এরকমই হয় তবে শুধু ক্রয়কারি একা দায়ী হতে পারেন না … সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ও সমান ভাবে দায়ী হবে।
পরিশেষঃ
ক্রয়কারি দপ্তরগুলো সরকারি কেনা কাটার ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব পালন করে থাকে এবং বেশিরভাগ ক্রয়কারি-ই হলো মাঠ পর্যায়ের দপ্তরগুলো। তাদেরকে যখন বরাদ্দ দেয়া হয় তখন অনেক নির্দেশনাও দেয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই নির্দেশনাগুলো দেয়া হয় আইনের মধ্যে থেকেই কাজের গতি ত্বরান্বিত করার বিষয়ে … যেমন কতদিনের মধ্যে টাকা খরচ করতে হবে, কতটাকার মধ্যে করতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বিষয় পালন করাই তখন ক্রয়কারি দপ্তরগুলোর জন্য মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থবছর শেষে কোন ক্রয়কারি দপ্তর যদি তার জন্যে বরাদ্দকৃত টাকা খরচ করতে না পারে সেক্ষেত্রে এটা সে দপ্তরের জন্য অদক্ষতা হিসেবেই দেখা হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তখন ব্যক্তিগতভাগে দায়ী করার প্রচেষ্টা থাকে।
বাংলাদেশ সরকারের এডিপি বাজেট প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে সরকারি ব্যায়ের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুটোই একটা আরেকটার পরিপূরক। এই বাজেটের সাথে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা বা দেশের বরাদ্দও থাকে। এইসব বরাদ্দের ব্যয় নির্ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন, পদ্ধতি, সময়, অনুমোদন প্রক্রিয়া, অনুমোদন কর্তৃপক্ষ, অডিট, ইত্যাদি নির্দিষ্ট করে বেঁধে দেয়া থাকে। কাজেই সাধারন অর্থে সরকারি কেনাকাটায় কোন একক ব্যক্তি বা দপ্তরের পক্ষে বড় ধরনের কোন দূর্ণীতি করা সম্ভব নয়। তবে, সংঘবদ্ধ দূর্ণীতিও অমূলক নয়। আর সংগবদ্ধ দূর্ণীতির ক্ষেত্রে এটা উদ্দেশ্য প্রনোদিত না অনিচ্ছাকৃত তা যেমন দেখা দরকার সেই সাথে এর সুবিধাভোগী গোষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট আইন-বিধি, যথাযথ কর্তৃপক্ষ, সাধারন প্রাকটিস, অপেশাদারিত্ব, ইত্যাদিও বাঁধা হয়ে আছে কি না তারও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
আর তা না হলে শুধু বালিশ নিয়ে কিছুদিন হৈ-চৈ হবে তারপর সব আবার বালিশের নিচেই চাপা পরে যাবে নতুন কোন চাঞ্চল্যকর ঘটনার অপেক্ষায়।
শুধুমাত্র Registered ব্যবহারকারি গন-ই সব ফিচার দেখতে ও পড়তে পারবেন। একবছরের জন্য Registration করা যাবে। Registration করতে ক্লিক করুন।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

ই-জিপিতে Individual Consultant হিসেবে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া
বর্তমান প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধি অনুযায়ি সব ধরনের দরপত্র অনলাইনে করতে হবে। সে হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় (e-GP)

ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন ফিঃ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পরামর্শকদের মধ্যকার বৈষম্য
বর্তমানে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) পোর্টালে জাতীয় ব্যক্তিগত পরামর্শকদের (Individual Consultant) জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৫,০০০ টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স লঃ প্রকিউরমেন্ট প্রফেশনালদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
আগে প্রকিউরমেন্ট বা কেনাকাটার মূল মন্ত্র ছিল – “সস্তায় এবং দ্রুততম সময়ে পণ্য আনা”। কিন্তু ২০২৪ সালের পরে এই সমীকরণটি

বাল্টিমোর ব্রিজ ধসঃ প্রকিউরমেন্ট এবং সাপ্লাই চেইন রিস্ক ম্যানেজমেন্টের ১টি ঐতিহাসিক ঘটনা
২০২৪ সালের ২৬শে মার্চ, যখন দালি (Dali) নামক একটি বিশাল কন্টেইনার জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরের ফ্রান্সিস স্কট কি ব্রিজে (Francis Scott