পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সংস্কার ২০২৫: প্রকৌশলীদের কৌশলগত নেতৃত্বের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট) ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতার ঘাটতি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের মতো সমস্যা বিদ্যমান। যদিও সরকারি ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহৃত হয়, তবুও এতোদিন ক্রয় ব্যবস্থাপনাকে মূলতঃ প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হতো, যেখানে প্রকৌশলীদের কৌশলগত ভূমিকা রাখার সুযোগ কম ছিল। প্রকৌশলীদের কাজ ছিল মূলতঃ সিভিল ওয়ার্কস কাজ বাস্তবায়ন।
এরকম প্রেক্ষাপটে, সম্প্রতি ২০২৫ সালের ৪ঠা মে Public Procurement (Amendment) Ordinance, 2025 এবং ২৮ সেপ্টেম্বর Public Procurement Rules 2025 (PPR 2025) কার্যকর হয়। এই যুগান্তকারী সংস্কারের লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এর ফলস্বরূপ, সরকারি প্রকল্পে কর্মরত প্রকৌশলীদের দায়িত্ব, অংশগ্রহণ এবং কার্যক্ষেত্র পূর্বের তুলনায় বহুগুণ প্রসারিত হয়েছে। ক্রয় আইন ও বিধিতে এরকম সংশোধনী প্রকৌশলী সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও নতুন দায়িত্ব তৈরি করেছে।
সরকারি ক্রয়ে প্রকৌশলীদের সুযোগ অবারিত হয়েছে
নতুন ক্রয় কাঠামো প্রকৌশলীদের কেবল প্রযুক্তিগত সমাধানদাতার পরিবর্তে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের ভূমিকা এখন নির্মাণ সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিকল্পনা, মূল্যায়ন থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সমাপ্তকরণ পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রাক্-প্রকল্প পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়ন: পিপিআর ২০২৫-এ Procurement Strategy প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়েই বাজার পরিস্থিতি, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, লাইফ-সাইকেল কস্টিং, টেকসইতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনা করে একটি কৌশল তৈরি করা। প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, প্রকৌশলীদের প্রকিউরমেন্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি যৌথভাবে কৌশল নির্ধারণের জন্য শুরুতেই যুক্ত থাকা অপরিহার্য। এটি পূর্ববর্তী কাঠামোর তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ: পূর্বের ক্রয় বিধিতে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন প্রস্তুতকরণে প্রকৌশলী বিশেষজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল না। নতুন অধ্যাদেশ ও বিধিমালায় প্রতিটি প্রকিউরমেন্ট প্যাকেজের টেকনিক্যাল কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের ন্যূনতম একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীকে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে (পিপিআর ২০২৫ এর বিধি ১১, ১২)। কঠোর নির্দেশনার মাধ্যমে দরপত্র মূল্যায়নে প্রকৌশলীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত সম্পৃক্ততার পথ তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রকৌশলীরা এখন পরিকল্পনা, নকশা পরীক্ষণ ও মূল্যায়নের মতো সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গুণগত নিশ্চয়তা, তদারকি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পিপিআর ২০২৫ সরবরাহকৃত সামগ্রী ও কাজের মান নিশ্চিত করার জন্য তৃতীয় পক্ষ তদারকির ধারণাকে উৎসাহিত করেছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। বৃহৎ ও জটিল প্রকল্পগুলোর জন্য স্বাধীন প্রকৌশল পরামর্শক ফার্ম বা প্রতিষ্ঠানকে গুণগত নিশ্চয়তা ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই ব্যবস্থা প্রকৌশলী সম্প্রদায়ের জন্য পেশাগত চাকরি ও পরামর্শ সেবার নতুন বাজার তৈরি করবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা: নতুন বিধিমালায় ই-জিপি ব্যবস্থাকে সর্বক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার ফলে প্রকিউরমেন্টের সব ধাপ ডিজিটাল নথিভুক্তির আওতায় এসেছে। টেন্ডার ডকুমেন্টেশন, স্পেসিফিকেশন প্রস্তুতি, ড্রয়িং–ডিজাইন আপলোড এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কার্যকর টেকনিক্যাল ইনপুট দেওয়া এখন অপরিহার্য। এছাড়াও, এই ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে সাইবার নিরাপত্তা, ডাটা ম্যানেজমেন্ট এবং সফটওয়্যার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে।
টেকসই ক্রয় এবং বিশেষায়িত পরিষেবা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পিপিআর ২০২৫-এ টেকসই সরকারি ক্রয় (Sustainable Public Procurement) এবং পরিবেশবান্ধব নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বড় প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা এবং টেকসই নকশা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শক্তি দক্ষতা, কার্বন নির্গমন হ্রাস এবং পণ্যের আয়ুষ্কাল এখন দরপত্র মূল্যায়নের অংশ। এর ফলে পরিবেশ প্রকৌশলী, নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষজ্ঞ এবং টেকসই অবকাঠামো ডিজাইনের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত প্রকৌশলীদের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
পাশাপাশি, পিপিআর ২০২৫-এ ‘Physical Services’ নামে একটি নতুন ক্যাটাগরিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৌশল কাজ, রক্ষণাবেক্ষণ, সাইট সুপারভিশন, ল্যাব টেস্টিং এবং সার্ভে-এর মতো প্রযুক্তিগত সেবাকে স্পষ্টভাবে পৃথক করেছে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালের সংস্কার বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগের ক্রয় বিধিতে প্রকৌশলীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়ক হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু নতুন অধ্যাদেশ ও বিধিমালায় এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন তাঁদের মতামতকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৌশল পেশার মর্যাদা ও কার্যকারিতা উভয়ই বৃদ্ধি করেছে।
তবে এই সুযোগের সাথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই নতুন বিধিমালা সফলভাবে প্রয়োগ করতে হলে প্রকৌশলীদের নিজেদেরও প্রস্তুত হতে হবে। তাদের procurement–সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, e-GP ব্যবস্থায় দক্ষতা, SPP সম্পর্কে ধারণা, বাজার বিশ্লেষণ এবং পরিমাপযোগ্য টেকনিক্যাল মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে গভীর দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন। উন্নততর প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং অবিরাম পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে প্রকৌশলীরাই এই সংস্কারের সফল বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হতে পারেন।
প্রকৌশলীরা যদি এই বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে বাংলাদেশের সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে। ২০২৫ সালের আইন ও বিধিমালা শুধুমাত্র প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এটি প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠারও একটি নতুন অধ্যায়।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Collusion in the Belgian Newspaper Distribution Sector
The Belgian competition authority has concluded its formal inquiry into systemic bid-rigging and horizontal agreements within the public procurement process

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক

সরকারি ক্রয়ে রেকর্ড ব্যবস্থাপনাঃ আইনি কাঠামো ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

লাম্প সাম নাকি টাইম-বেসড কন্ট্রাক্ট – কোনটি কখন ব্যবহার করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ে প্রধানত কাজের ধরন ও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হয়।