ট্যারিফঃ ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সাপ্লাই চেইনের নতুন গতিপথ
২০২৫ সালে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্যারিফ বা শুল্ক। গত ছয় বছর ধরে সাপ্লাই চেইনগুলো কোভিড-১৯ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধের মতো বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসলেও, বর্তমান সময়ে ট্যারিফই হয়ে উঠেছে প্রধান চালিকাশক্তি।
সম্প্রতি, বিশ্ববিখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান McKinsey & Company এ বিষয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত ছয় বছর ধরে ম্যাককিনজি বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন লিডারদের ওপর বার্ষিক জরিপ পরিচালনা করছে যাতে বোঝা যায় মহামারী (COVID-19) বা যুদ্ধের মতো বড় সংকটের পর কীভাবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্থিতিস্থাপকতা (resilience) বিবর্তিত হচ্ছে।
২০২৫ সালে সাপ্লাই চেইনের জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শুল্ক (Tariffs)। কোম্পানিগুলো কীভাবে এই নতুন শুল্ক নীতির মোকাবিলা করছে এবং এটি তাদের ব্যবসায়িক মডেলে কী পরিবর্তন আনছে, তা বিশ্লেষণ করতেই এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো কেন তাদের দীর্ঘমেয়াদী ডিজিটাল রূপান্তর বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিক বা কৌশলগত পদক্ষেপের (যেমন: ইনভেন্টরি বাড়ানো বা নিয়ারশোরিং) দিকে ঝুঁকছে, তা এই প্রতিবেদনে ভালভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালের বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় পাওয়া যায়। নিচে তা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো:
শুল্ক (Tariffs) এখন সাপ্লাই চেইনের প্রধান ঝুঁকি: ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনের জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন শুল্ক নীতি। এই সোর্স থেকে বড় শিক্ষা হলো, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন মহামারী বা যুদ্ধের মতো বাহ্যিক সংকটের পাশাপাশি শুল্কের মতো ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ কোম্পানি এই শুল্কের কারণে প্রভাবিত হচ্ছে।
কেবল খরচ বাড়ানোই সমাধান নয় (Tactical Cost Management): শুল্কের কারণে অতিরিক্ত খরচ হলে অনেক কোম্পানি তা সরাসরি গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সোর্স অনুযায়ী, গড়পড়তা মাত্র ৪৫ শতাংশ কোম্পানি এই খরচ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এখান থেকে শিক্ষণীয় হলো, অধিকাংশ সফল কোম্পানি খরচ কমানোর অন্যান্য কৌশল (যেমন: সাপ্লাই চেইনের পরিবর্তন বা ইনভেন্টরি অপ্টিমাইজেশন) ব্যবহার করে নিজেদের ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
সাপ্লাই চেইনের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকরণ (Regionalization): শুল্কের প্রভাব এড়াতে কোম্পানিগুলো তাদের সাপ্লাই চেইনকে আঞ্চলিক বা স্থানীয় করার দিকে ঝুঁকছে। যেমন, অনেক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে তাদের সাপ্লাই চেইন সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, পূর্ব ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাজারের কাছাকাছি পণ্য উৎপাদন বা সোর্সিং করা (Nearshoring/Onshoring) এখন ঝুঁকির মোকাবিলায় একটি প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গভীর স্তরের সরবরাহকারী সম্পর্কে স্বচ্ছতা (Multi-tier Visibility): শুল্ক এবং আইনি বাধ্যবাধকতা মানার জন্য কেবল সরাসরি সরবরাহকারীর (Tier-1) তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়। সোর্স থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো, সাপ্লাই চেইনের দ্বিতীয় বা তার পরবর্তী স্তরের সরবরাহকারীদের (Tier-2 and beyond) সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। যদিও এটি কঠিন, তবুও শুল্কের প্রভাব বুঝতে এবং আইনি নিয়ম পালনে এই গভীর দৃশ্যমানতা সহায়ক হয়।
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ বনাম দীর্ঘমেয়াদী রূপান্তর: সঙ্কটকালীন সময়ে কোম্পানিগুলো অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের চেয়ে তাৎক্ষণিক এবং কৌশলগত পদক্ষেপকে (যেমন: ইনভেন্টরি বাড়ানো বা সরবরাহকারীর সাথে দর কষাকষি) বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে সোর্স অনুযায়ী, যারা দ্রুত এই সাময়িক কৌশল থেকে বেরিয়ে ডিজিটাল এবং উন্নত প্রযুক্তিতে (যেমন: AI বা উন্নত প্ল্যানিং সিস্টেম) ফিরে আসবে, তারাই পরবর্তী প্রতিকূলতার জন্য বেশি প্রস্তুত থাকবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা: সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় AI-এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, চাহিদা পূর্বাভাস (demand forecasting) এবং ইনভেন্টরি অপ্টিমাইজেশনের মতো ক্ষেত্রে এর বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে সাপ্লাই চেইনকে স্থিতিস্থাপক (resilient) করতে আধুনিক প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আধুনিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোকে কেবল তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করলে চলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্বচ্ছতা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে।
Source: Supply chain risk pulse 2025: Tariffs reshuffle global trade priorities
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Collusion in the Belgian Newspaper Distribution Sector
The Belgian competition authority has concluded its formal inquiry into systemic bid-rigging and horizontal agreements within the public procurement process

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক

সরকারি ক্রয়ে রেকর্ড ব্যবস্থাপনাঃ আইনি কাঠামো ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

লাম্প সাম নাকি টাইম-বেসড কন্ট্রাক্ট – কোনটি কখন ব্যবহার করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ে প্রধানত কাজের ধরন ও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হয়।