বিশ্বব্যাংকের যুগান্তকারী পদক্ষেপ: ক্রয়নীতিতে সামাজিক উন্নয়নের নতুন নির্দেশনা
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি বর্তমানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এই অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়তা করার জন্য বিশ্বব্যাংক তার ক্রয় নীতিতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা সংযোজন করছে।
আগামী দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১.২ বিলিয়ন তরুণ কর্মসংস্থানে প্রবেশ করবে, কিন্তু এই দেশগুলোতে মাত্র 0.৪২ বিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এই বিশাল কর্মসংস্থান ঘাটতি যদি মোকাবেলা করা না হয়, তাহলে তা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত হবে এবং সর্বপরি দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই জরুরি সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক তাদের প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন উপায়ে কাজ করার উপর জোর দিচ্ছে।
কিভাবে বিশ্বব্যাংক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে ?
বিশ্বব্যাংক তাদের ‘প্রকিউরমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক’ ব্যবহার করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষতা উন্নয়নকে সহায়তা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে।
বিনিয়োগ প্রকল্প অর্থায়ন (Investment Project Financing) হলো বিশ্বব্যাংকের প্রধান একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে তারা একটি দেশের সরকারি খাতের উন্নয়নে সহায়তা করে, বিশেষ করে অবকাঠামো, মানব উন্নয়ন, কৃষি, জন প্রশাসন এবং অন্যান্য খাতে। এই প্রকল্পগুলির অধীনে পণ্য, কার্য (Civil Works) এবং পরিষেবা (Services) ক্রয় করা হয়, যা উন্নয়ন ও অগ্রগতির কাংখিত ফলাফল অর্জনের জন্য অপরিহার্য – যেমন রাস্তা নির্মাণ, স্কুল সজ্জিতকরণ বা একটি দেশের বিচার ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ।
বিশ্বব্যাংকের ক্রয় কাঠামোর এই আপডেটটি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রবর্তিত পদক্ষেপগুলির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে যা ব্যাংক-অর্থায়নকৃত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলিতে উচ্চ যোগ্য দরদাতাদের আকর্ষণ এবং উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও ভাল ফলাফল প্রদানের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে দরপত্র মূল্যায়নে গুণগত মানের উপর (Quality) অধিক জোর দেওয়া, উচ্চ-মূল্যের চুক্তির মূল্যায়নে life-cycle costs, innovation, sustainability এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহ অন্যান্য গুণগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া নিশ্চিত করা।
নতুন নীতিমালার মূল দিকগুলি:
- ৩০% স্থানীয় শ্রম ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা: আন্তর্জাতিক কার্য (Civil Works) ক্রয়ের চুক্তিতে (যেমন পরিবহন ও জ্বালানী অবকাঠামোর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে মোট শ্রম ব্যয়ের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ স্থানীয় শ্রম নিশ্চিত করতে হবে। এই নতুন নিয়মটি ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
- দক্ষতা উন্নয়নে উৎসাহ: বিশ্বব্যাংক তাদের ক্লায়েন্ট দেশগুলিকে স্থানীয় শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়নে উৎসাহিত করছে। বিডিং নথিতে নন-প্রাইস মানদণ্ড (non-price criteria) অন্তর্ভুক্ত করে, যারা স্থানীয় দক্ষতা বিকাশের পরিকল্পনা দেখাবে, তাদের পুরস্কৃত করা যেতে পারে মর্মে নীতগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই নতুন উদ্যোগটি বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট ফ্রেমওয়ার্কের বিবর্তনকে প্রতিফলিত করছে, যা অর্থ সাশ্রয় (value for money), অর্থনীতি, দক্ষতা, সততা, স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং উদ্দেশ্য পূরণের (fit-for-purpose) মতো মূল নীতিগুলি বজায় রেখেছে।
এই নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- আয় বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন: স্থানীয় শ্রম ব্যবহার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখে, যা পরিবারগুলিকে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরি করতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে পুনরায় বিনিয়োগ করতে সক্ষম করে।
- সম্প্রদায় শক্তিশালীকরণ: স্থানীয় প্রতিভাদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বব্যাংক বিশ্বজুড়ে সম্প্রদায়গুলিকে শক্তিশালী করছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলছে।
- দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ: বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট গালিনা এ. ভিন্সলেট (Gallina A. Vincelette) বলেছেন, “বিশ্বব্যাংক-অর্থায়িত প্রকল্পগুলিতে স্থানীয় শ্রমের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিয়ে, আমরা শুধুমাত্র আমাদের ক্লায়েন্ট দেশগুলিতে মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছি না, বরং স্থানীয় সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করছি। এই পদ্ধতিটি একটি দক্ষ এবং আরও সুসজ্জিত কর্মীবাহিনী তৈরি করতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে”।
পরিশেষ
এই উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানাচ্ছেন। এটিকে বিশ্বব্যাংকের সামাজিক স্থায়িত্ব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্রয়নীতিতে সামাজিক উন্নয়নের এসব নতুন দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন ক্রয় প্রক্রিয়াকে উন্নয়নের একটি শক্তিশালী চালিকা শক্তি হিসেবে গড়ে তুলবে। এটি উন্নয়ন অংশীদারদের বাধা দূর করার পাশাপাশি প্রকল্পের স্থানীয় স্তরে মালিকানা নিশ্চিত করবে।
কেউ কেউ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই নিয়মের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হবে, কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নারীরা কর্মসংস্থান এবং মানসম্মত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির অভাবে অধিক বৈষম্যের স্বীকার হোন।
তবে, এরই মধ্যে অনেকেই এই উদ্যোগকে “অনেক বিলম্বিত” বলে মন্তব্য করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে ভারত সহ অনেক দেশ ইতিমধ্যেই ক্ষুদ্র (SME), ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME) এর মাধ্যমে অনুরূপ সামাজিক উন্নতি নীতি তাদের জাতীয় ক্রয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এছাড়াও, মাঠ পর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জও আসতে পারে:
- ঠিকাদারদের দ্বারা স্থানীয় শ্রমকে পাশ কাটানো: ঠিকাদাররা খরচ কমানোর জন্য প্রায়শই সস্তা অভিবাসী শ্রমিক নিয়ে আসেন, যার ফলে স্থানীয় শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়। এই আশংকা বৃদ্ধি পাবে কি না ?
- দক্ষ স্থানীয় যুবকদের বেকারত্ব: প্রধান অবকাঠামো প্রকল্পগুলি (Mega Construction Projects) তাদের নিজস্ব জেলায় চললেও, দক্ষ স্থানীয় যুবকরা প্রায়শই বেকার থাকে। এই আশংকা কিভাবে মোকাবেলা করা হবে ?
এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলা করার জন্য স্বচ্ছ শ্রম নিরীক্ষা, স্থানীয় নিয়োগের বাধ্যতামূলক নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন ও নির্মাণ কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত সঠিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচী নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া উচিত।
সামগ্রিকভাবে, বিশ্বব্যাংকের এই নতুন পদক্ষেপটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তবে এর বাস্তবায়ন ও নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে কঠোরতা ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিস্তারিত দেখতে ক্লিক করুন।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা