সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা
Md. Moktar Hossain MCIPS, PMP, CPCM
Deputy Director (Xen)
Directorate of Design & Inspection-01
Bangladesh Power Development Board
Mobile: 01722044335
Email: moktar031061@gmail.com
=================================
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০২৫ এর পেশাগত অসদাচরণ, অপরাধ, চুক্তি বাতিল শিরোনামে সংশ্লিষ্ট বিধির পাশাপাশি The Code of Ethics for Public Procurement বা সরকারি ক্রয়ের আচরণবিধি সংযুক্ত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ক্রয়কারী (PE) ও ক্রয়কার্যের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিকে কঠোরভাবে পেশাগত নৈতিকতা এবং আইনি বিধিবিধান মেনে চলতে হয়। এই নিবন্ধে ক্রয়কারী ও ক্রয়কার্যের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তির করণীয়, বর্জনীয় এবং আইন ও বিধিলঙ্ঘনের পরিণাম বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
সাধারণ নীতিমালা
পিপিআর-২০২৫ এ তফসিল-২০ এর অনুচ্ছেদ ৫ দ্রষ্টব্যঃ
সরকারি ক্রয়ে নিয়োজিত প্রত্যেক জনসেবককে পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে হয়। সাধারণ নীতিমালার প্রধান দিকগুলো হলো:
নিঃস্বার্থ সেবা: প্রতিটি কাজ করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে এবং ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে থেকে।
আইন ও চুক্তির প্রতি আনুগত্য: প্রচলিত আইন, বিধিমালা (PPR) এবং চুক্তিবদ্ধ বাধ্যবাধকতাগুলো কঠোরভাবে পালন করা।
সততা ও নিষ্ঠা: ক্রয়কারীর ভেতরে এবং বাইরে সকল লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখা।
পেশাগত উৎকর্ষ: সরকারি ক্রয়ের সর্বশেষ প্রযুক্তি ও পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত থাকা এবং নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রীয় সম্পদের (Resources) সর্বোত্তম (Optimize) e¨বহার নিশ্চিত করা।
অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত: নিজের অধস্তন বা সহকর্মীদের মধ্যে নৈতিক আচরণের সর্বোচ্চ মান উৎসাহিত করা এবং নিজে তা মেনে চলা।
কোন কাজগুলো অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে ?
পিপিআর-২০২৫ এর বিধি ১৪৯(২) অনুযায়ী, ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ ও চুক্তি বাস্তবায়নকালে ক্রয়কার্যের সহিত সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির (ক্রয়কারী বা ক্রয়কার্যের সহিত যেকোন ব্যাক্তি) জন্য নিম্নোক্ত কর্মকাণ্ডগুলো ‘পেশাগত অসদাচরণ’ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবেঃ
দুর্নীতিমূলক কর্ম (Corrupt Practice): ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো উপহার, চাকরির প্রস্তাব বা আর্থিক সুবিধা চাওয়া যাবে না এবং কেউ প্রস্তাব করলে তা গ্রহণ করা যাবে না।
প্রতারণামূলক কর্ম (Fraudulent Practice): কোনো সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনো বিষয়ে তথ্য গোপন করা বা তথ্যের বিকৃত উপস্থাপন করা যাবে না। জনসেবক হিসেবে কোনো নথিতে মিথ্যা বিবৃতি প্রদান থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।
চক্রান্তমূলক কর্ম (Collusive Practice): দরপত্রদাদাদের মধ্যে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নষ্ট করার লক্ষ্যে কোনো প্রকার গোপন যোগসাজশ বা চক্রান্তে নিজে লিপ্ত হওয়া যাবে না কিংবা অন্য কাউকে এ ধরনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যাবে না।
জবরদস্তিমূলক কর্ম (Coercive Practice): কোনো দরপত্রদাতাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জানমালের ক্ষতিসাধনের হুমকি দিয়ে ক্রয়ের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাবে না।
প্রতিবন্ধকতামূলক কর্ম (Obstructive Practice): তদন্ত শুরু হলে তদন্তকারীকে কোনো প্রকার মিথ্যা তথ্য দেওয়া যাবে না এবং কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ বা নথিপত্র নষ্ট, লুকানো বা পরিবর্তন করা যাবে না।
কোন কাজগুলো নিষিদ্ধ বা অগ্রহণযোগ্য ?
পিপিআর-২০২৫ এর তফসিল-২০ দ্রষ্টব্যঃ
পুরস্কার বা পদবি সংক্রান্ত: কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো ক্রয়কারী ও ক্রয়কার্যের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির জন্য কোনো বিদেশি পুরস্কার, সম্মানসূচক পদবি বা অলঙ্করণ (decoration) প্রদানের প্রস্তাব করলে বা সেটি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলে তা গ্রহণ করা যাবে না।
বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ: ক্রয় দলিল (Procurement Document) বা সাহায্য চুক্তিতে (Aid Agreement) সুনির্দিষ্টভাবে অনুমোদিত না থাকলে, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশে প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণের প্রস্তাব গ্রহণ করা যাবে না বা এ জাতীয় কোনো সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগে শামিল হওয়া যাবে না।
আর্থিক লেনদেন ও ঋণ: ক্রয় সংক্রান্ত লেনদেন রয়েছে এমন কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়া যাবে না অথবা তাকে টাকা ধার দেওয়া যাবে না। এছাড়া, নিজেকে এমন কোনো আর্থিক বাধ্যবাধকতায় জড়ানো যাবে না যা পেশাগত নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করে।
সম্পত্তি ও নির্মাণ সংক্রান্ত: কোনো ব্যক্তির নিকট হতে আবাসিক বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণে কোনো প্রকার সহায়তা বা উৎসাহ গ্রহণ করা যাবে না।
বিনিয়োগ ও ফাটকাবাজি: কোনো মূল্যবান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে কোনো ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যাবে না এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ফাটকাবাজিতে (Speculate) কারো দ্বারা উৎসাহিত হওয়া যাবে না।
ব্যবসা ও নিয়োগ: নিজের এখতিয়ারাধীন বা কর্মএলাকার মধ্যে কোনো ব্যক্তির অধীনে নিজে বা পরিবারের কোনো সদস্যকে ব্যবসায় নিয়োজিত করা যাবে না অথবা দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে অন্য কোনো কাজে নিয়োগ পাওয়া বা দেওয়ার বিষয়ে কারো প্ররোচনা গ্রহণ করা যাবে না।
উপহার ও আতিথেয়তা: কোনো ক্রয়কারী ও ক্রয়কার্যের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি এমন উপহার গ্রহণ করবেন না যা তাকে দাপ্তরিক বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করে। তবে ব্যবসায়িক ডায়েরি বা ক্যালেন্ডারের মতো সামান্য মূল্যের উপহার গ্রহণ করা যাবে, যার প্রতিটির মান ৫,০০০ টাকার বেশি নয়।
স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest): যদি কোনো কর্মকর্তা দেখেন যে তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থ (যেমন: নিকটাত্মীয় বা বন্ধুর বিনিয়োগ) কোনো দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক, তবে তাকে তা লিখিতভাবে ঘোষণা করতে হবে।
তথ্য আদান-প্রদান: সরকারি গোপন নথি বা তথ্য কেবল অনুমোদিত ক্ষেত্রেই আদান-প্রদান করা যাবে; অপ্রাসঙ্গিক বা সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করা আচরণবিধির লঙ্ঘন।
আইন ও বিধি লঙ্ঘনের শাস্তি ও প্রতিকার
আইন ও এই বিধিমালা প্রযোজ্য হওয়া সাপেক্ষে, কোনো ব্যক্তি বা ক্রয়কারীর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি পেশাগত অসদাচরণ সংক্রান্ত কোনো অপরাধ করে তা হলে তাঁহার বিরুদ্ধে পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ৬৪(৩) বর্ণনা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ এবং পিপিএ-২০০৬ এর ধারা-৬৪ (৪) এর বর্ণনা অনুযায়ী দণ্ডবিধি- ১৮৬০ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ

Example: Transparency, Ethics & Accountability in Govt Procurement
পরিশেষ
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ক্রয়কারী ও ক্রয়কার্যের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখা অপরিহার্য।
কী গ্রহণীয় এবং কী বর্জনীয় সে বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে সর্বদা ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান (HOPE) বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রতিপালনই ক্রয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও জনবান্ধব করে তুলতে পারে।
আরও দেখুনঃ
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

সরকারি ক্রয়ের আয়নাঃ ক্রয় প্রক্রিয়া-উত্তর পুনরীক্ষণ
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় অগ্রাধিকারঃ বিধিমালা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

PPR-2025: এক নজরে সকল ক্রয় সংশ্লিষ্ট কমিটি
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

চুক্তি সংক্রান্ত জামানতঃ সরকারি ক্রয়ে নিরাপত্তা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: