ই-জিপি তে এলটিএম নিয়ে আস্থা না অনাস্থা !?!
বাংলাদেশে সরকারি কেনাকাটায় (Public Procurement) পণ্য, কার্য, সেবা, ইত্যাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ক্রয় পদ্ধতি আছে। তন্মধ্যে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা এলটিএম (Limited Tendering Method – LTM) সরকারি ক্রয় পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি পদ্ধতি।
LTM পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন।
উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম – OTM) সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য দরপত্র পদ্ধতি হলেও দরপত্রে অংশগ্রহনের হার বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে এলটিএম দরপত্র পদ্ধতিই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
বিস্তারিত দেখুনঃ বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় টেন্ডার পদ্ধতি কি ?
কিন্তু এই জনপ্রিয় পদ্ধতি নিয়ে অংশগ্রহনকারিদের মধ্যে অভিযোগের অন্ত নেই। ই-জিপি তে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা LTM নিয়ে হযবরল অবস্থা কাটছেই না।
বিস্তারিত দেখুনঃ ই-জিপি তে LTM নিয়ে হযবরল অবস্থা।
LTM সবচেয়ে জনপ্রিয় টেন্ডার পদ্ধতি হবার পরও এটা নিয়েই ক্রয়কারি ছাড়াও বিশেষকরে ঠিকাদারদের মধ্যে আস্থার সংকট আছে। এই আস্থার সংকট থাকার কারণ কি ?
আসুন, সাম্ভাব্য কয়েকটি কারন দেখা যাক।
LTM টেন্ডার বলতে এখানে অনধিক ৩ কোটি টাকা মূল্যের Works টেন্ডার (National) যেখানে লটারির মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয় বোঝাবে।
LTM তালিকা নিয়ে আস্থার সংকট
LTM এর একটি গূরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ঠিকাদার তালিকাভুক্ত করণ। বিধি মোতাবেক তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী বা ঠিকাদারদের নিকট হতে অথবা সরবরাহকারীর বা ঠিকাদারের সংখ্যাল্পতা থাকলে সরাসরি সম্ভাব্য সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের নিকট হতে দরপত্র আহবান করা যাবে। এজন্য আগেই অফলাইনে তালিকা তৈরী করতে হবে। শুধুমাত্র উক্ত তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের নিকট হতে দরপত্র আহ্বান করা যাবে।
এই তালিকাভুক্তকরণের ১ম সমস্যা হলো অফলাইনের অনুমোদিত তালিকার সাথে সমন্বয় করে ই-জিপিতে সার্চ করে দরপত্রদাতা নির্বাচন ও তালিকা প্রস্তুত। কিন্তু এই ই-জিপিতে প্রক্রিয়াটি ইউজার ফ্রেন্ডলি নয়।
এর জন্য ক্রয়কারিকে জেলা/এলাকা ওয়ারী সার্চ দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করতে হয়। এক্ষেত্রে জেলার সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই তালিকা থেকে আবার প্রয়োজন অনুযায়ি সিলেক্ট করা যায় না। ফলে ক্রয়কারির দপ্তরে তালিকাভুক্ত নয় এমন অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও ই-জিপি’র LTM দরপত্রে অংশ নিতে পারে।
অন্যদিকে, আবার অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারির দপ্তরে অফলাইনে তালিকাভুক্ত থাকলেও ই-জিপিতে তাদের ঠিকানা আপডেট না থাকার কারনে ই-জিপি’র LTM দরপত্রে তারা বাদ পরে যায়। ফলে যোগ্যতা থাকার পরও তারা ই-জিপি সিস্টেমে Invitation পায় না। ফলে ই-জিপি’র LTM দরপত্রে অংশগ্রহনও করতে পারে না।
ই-জিপি’র ভিতরেই ঠিকাদাররা যেকোন সময় তাদের অফিসের ঠিকানা আপডেট করতে পারে। ফলে কোন কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জেলার LTM দরপত্র নোটিশ পায়, আবার অনেকে নিজ জেলারও নোটিশ পায় না।
দরপত্র জামানত ফেরত নিয়ে অস্থিরতা
পিপিআর-০৮ এর বিধি অনুযায়ি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের পর মূল্যায়িত গ্রহণযোগ্য ১ম, ২য় এবং ৩য় সর্বনিম্ন দরপত্রের জামানত ব্যতীত অন্যান্য মূল্যায়িত গ্রহণযোগ্য দরপত্রদাতাদের দরপত্র জামানত আবেদনের প্রেক্ষিতে ফেরত দেয়া যাবে।
এখন, সে অনুযায়ি LTM দরপত্রের লটারিতে ৩ জনের নাম আসার উচিত। কিন্তু শুধু একজনের নাম আসে। একারনে চুক্তি স্বাক্ষর হবার আগ পর্যন্ত সব দরপত্র জামানত আটকে রাখতে হয়। এতে মাঠ পর্যায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। অনেক সময় ক্রয়কারিগন দরদাতাদের চাপে দরপত্র জামানত (Tender Security) release করে দিচ্ছেন। তখন আবার লটারিতে বিজয়ী দরদাতার সাথে কোন কারনে চুক্তি সম্পাদন না হলে পুনর্মূল্যায়ন করার পর নতুন বিজয়ী দরপত্রদাতার সাথে চুক্তি করা যাচ্ছে না। দ্বিমূখী সমস্যা।
কারিগরি মূল্যায়নে দূর্ণীতির সুযোগ
LTM দরপত্রে কারিগরি মূল্যায়নে (Technical Evaluation) কাউকে বাদ দিলে তা জানার সুযোগ নেই। লটারির আগে প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেই। ফলে দূর্ণীতির সুযোগ আছে।
লটারিতে সন্দেহ
লটারি নিয়ে তো অনেক ক্যাচাল।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ ই-জিপি তে লটারি নিয়ে অবিশ্বাস ও কিছু সুপারিশ
পুনর্মূল্যায়নে সমস্যা
কোন কারনে LTM দরপত্রে পুনর্মূল্যায়ন বা Re-evaluation হলে তখন লটারি আবার করতে হয়। এক্ষেত্রে পূর্বের লটারিতে বিজয়ী দরপত্রদাতার নাম আবার লটারিতে না আসার সম্ভাবনাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে পুনর্মূল্যায়নের পরও আগের মূল্যায়ন সঠিক মর্মে মূল্যায়ন কমিটি সুপারিশ করছে। সেক্ষেত্রে আর প্রথম মূল্যায়ন অনুযায়ি লটারিতে উত্তীর্ণ দরপত্রদাতাকে সুপারিশ করা যাচ্ছে না শুধুমাত্র লটারিতে ২য় বার নাম না আসার কারনে। ফলে মূল্যায়ন কমিটি অনেক বিব্রত অবস্থায় পড়ছে।
মূল্যায়নে সময় বেশি লাগে
দেখা যায় যে LTM দরপত্রে অধিক হারে দরপত্র দাখিল হয়ে থাকে। উন্মুক্ত দরপত্রে যেখানে গড়ে ৩-৪ টি দরপত্র দাখিল হয় সেখানে LTM দরপত্রে ১০০ এর অধিক দরপত্রও দাখিল হতে দেখা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রেও, কারিগরি মূল্যায়ন সম্পন্ন করে তবেই লটারি করতে হয়। এভাবে ১০০ এর উপর দরপত্রের দলিলাদি ডাউনলোড করে মূল্যায়ন করা কঠিন, সময় বেশি লাগছে।
পরিশেষে, আইনী বাধ্যবাধকতা, সহজ প্রক্রিয়া ও সংক্ষিপ্ত সময়ে দরপত্র দাখিল করতে পারার সুবিধি থাকার কারনে ক্রয়কারি ও ঠিকাদাররা এই পদ্ধতি ব্যপক ভাবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু, এরপরও LTM দরপত্রে সার্বিক আস্থা কাটানোর কোন দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা