ই-জিপি তে লটারি নিয়ে নাভিশ্বাস, অবিশ্বাস ও কিছু সুপারিশ
উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম – OTM) সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য দরপত্র পদ্ধতি হলেও দরপত্রে অংশগ্রহনের হার বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে এলটিএম (Limited Tendering Method – LTM) দরপত্র পদ্ধতিই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
বিস্তারিত দেখুনঃ বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় টেন্ডার পদ্ধতি কি ?
কিন্তু ই-জিপি তে এলটিএম নিয়ে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট আছে বিশেষ করে অনেক ঠিকাদাররাই ই-জিপিতে এলটিএম এর লটারি সিস্টেম কে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে।
আজকে এর কারন বোঝার চেষ্টা করবো।
LTM দরপত্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো লটারি। এই লটারির কারণেই মূলতঃ এলটিএম এর কার্য ক্রয় (Works Procurement) এর ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত দরপত্র পদ্ধতিই বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
এই LTM দরপত্রে কারিগরি মূল্যায়ন (Technical Evaluation) এর পর যাদের দাখিলকৃত দর সমান তাদের মধ্যে লটারি অনুষ্ঠিত হয়। তীব্র প্রতিযোগিতার কারনে স্বাভাবিক ভাবেই বেশিরভাগ ঠিকাদাররাই ৫% কমে টেন্ডার দাখিল করেন। ফলে অংশগ্রহনকারী বেশিরভাগ ঠিকাদারদের মধ্যেই রেট সমান হয়ে যায়। আইন অনুযায়ি এদের মধ্যেই লটারি হবার কথা। কিন্তু এখান থেকেই সন্দেহের সূচণা। এখানে সমস্যাগুলো হচ্ছেঃ
সন্দেহ ১ঃ কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন (TER1 এবং TER2) ঠিকাদারদের কাছে গোপন থাকে। ফলে অংশগ্রহনকারী ঠিকাদাররা কেউই জানতে পারেন না যে কাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে লটারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সঠিকভাবে দরপত্র মূল্যায়ন হলেও এর মাধ্যমেই সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে।
সন্দেহ ২ঃ অনেক ঠিকাদাররা সন্দেহ করেন যে তাদের কে আগেই অন্যায় ভাবে অথবা ছোট কোন কারনে যোগ সাজশের মাধ্যমে কারিগরি মূল্যায়নে বাদ দেয়া হয়। ফলে আসল প্রতিযোগিতা অর্থাৎ লটারি শুরুর সময় মাত্র কয়েকজন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট থাকে। ফলে ক্রয়কারীর পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠাই শেষ পর্যন্ত কাজ পায়।
সন্দেহ ৩ঃ গত অর্থবছরের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে গড়ে প্রতিটি জেলায় এলটিএম পদ্ধতিতে আহবানকৃত প্রতিটি প্যাকেজের বিপরীতে প্রায় ৫০ এর অধিক দরপত্রদাতা অংশগ্রহন করেছেন যা অন্যান্য যে কোন পদ্ধতিতে আহবানকৃত দরপত্রের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। অনেক জেলায় দেখা গিয়েছে প্রায় প্রতি প্যাকেজেই ১০০ এর অধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
একই ক্রয়কারীর অধীনে ক্রমাগত একেকটি প্যাকেজে অধিক সংখ্যক টেন্ডার দাখিল হলে মূল্যায়ন কমিটির জন্য সঠিকভাবে কারিগরি মূল্যায়ন করা অসম্ভব হয়ে পরে। তখন দেখা যায় মূল্যায়ন কমিটি তাদের কারিগরি মূল্যায়ন সহজ করার জন্য এবং মূল্যায়নের সময় বাঁচানোর জন্য কারিগরি মূল্যায়নে এক প্রকার চোখ বন্ধ করেই সব প্রতিষ্ঠানকে রেসপন্সিভ বিবেচনা করে মূল্যায়ন শেষ করেন। তারপর লটারির আয়োজন করা হয়। এরপর বিজয়ী দরপত্রদাতা পাওয়া গেলে তখন সঠিকভাবে যাচাই বাছাই করা হয়। এইক্ষেত্রে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি মূল্যায়নে যদি সমস্যা পাওয়া যায় তখন পোষ্ট ইভালুয়েশন (Post Verification – দাখিল-উত্তর যোগ্যতা যাচাই) এ যেয়ে তা বাদ দেয়া হয়। এরপর আবার লটারি আয়োজন করা হয়। এভাবে যতক্ষন গ্রহনযোগ্য প্রতিষ্ঠান না পাওয়া যায় ততক্ষন এই ট্রায়াল এন্ড এরর চলতে থাকে। কিন্তু এভাবে দরপত্র মূল্যায়ন বিধি মোতাবেক গ্রহনযোগ্য নয়। ফলে দেখা যায় যে অনেক প্রতিষ্ঠান লটারিতে বিজয়ী হলেও কাজ পাচ্ছেন না। এ ধরনের কার্যক্রমও অংশগ্রহনকারী ঠিকাদারদের সন্দেহকে উসকে দিচ্ছে।
সন্দেহ ৪ঃ কাকতালীয় হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে একই ঠিকাদার পর পর লটারিতে জয়ী হচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ১০০ এর উপর দরপত্রে অংশ নিয়েও কোন লটারিতে নামই উঠছে না। অনেকই মনে করেন যে, LTM Tender এর Lottery তে পক্ষপাতিত্ব (Partiality) করা হয় এজন্য অমুক ঠিকাদার একাই একাধিক (২/৩/৪ টা) কাজ/ টেন্ডার পায় কিন্তু আমি কাজ পাই না। আসলে, ঘটনা টা কি!!!
যদিও এটা হতেই পারে। কিন্তু এর সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাক্ষ্যা ঠিকাদারদের কাছে পরিষ্কার না থাকায় LTM দরপত্রে লটারি নিয়ে অবিশ্বাস ও সন্দেহ আরও গাঢ় হচ্ছে।
LTM দরপত্রে লটারি নিয়ে এই অবিশ্বাস ও সন্দেহ কমানোর জন্য কয়েকটি সুপারিশঃ
১। পিপিআর-০৮ এর বিধি ৯৮ক সংশোধন করা উচিত। এক্ষেত্রে কারিগরি মূল্যায়নের পর সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতাগণের মধ্যে লটারি না করে বরং প্রথমেই লটারি আয়োজন করা যায়। যেহেতু দরপত্র উন্মুক্ত হবার সাথে সাথেই সর্বনিম্ন দরদাতাগণের তালিকা দেখা যায়, কাজেই, প্রথমেই লটারির মাধ্যমে বিজয়ী (কিন্তু মূল্যায়িত নয়) সর্বনিম্ন দরদাতা নির্ধারণ করে তারপর এই ১টি দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন করা হলে সময় কম লাগতো এবং কাজ অনেক অনেক কমে যেতো। মূল্যায়ন কমিটির ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত অনিয়ম করার সম্ভাবনাও কমে যেত।
২। কারিগরি মূল্যায়নের পর রেসপন্সিভ দরদাতা কারা এবং কাদের মধ্যে লটারি হচ্ছে তা উন্মুক্ত করা উচিত। তাহলে মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের মধ্যেই সতর্কতার মনোভাব তৈরি হবে আশা করা যায়। অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানদের কাছে লটারির স্বচ্ছতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
৩। পিপিআর-০৮ এর বিধি ৯৮ক(৩) অনুযায়ি LTM দরপত্রের প্রথম লটারিতেই একসাথে ৩টি বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের নাম আসার উচিত। বর্তমান ই-জিপিতে শুধু ১টি নাম আসে। ৩টি নাম একসাথে পাওয়া গেলে বার বার লটারির উপর চাপ কমতো এবং পুনঃ পুনঃ লটারির সন্দেহ লাঘব হতো।
৪। পিপিআর-০৮ এর বিধি ৯৮ক(২)(ক) অনুযায়ি লটারি অনুষ্ঠানের স্থান, তারিখ ও সময় ক্রয়কারী দরদাতাদের লিখিত নোটিশের মাধ্যমে জানাতে হয়। কিন্তু ই-জিপিতে লটারির তারিখ ঘোষণা করার কোন ব্যবস্থা নেই। ই-জিপি সিস্টেমেই তা থাকা উচিত। লটারির আগেই যেন সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহনকারী ঠিকাদাররা তা আগাম জানতে পারে। তাহলে মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের মধ্যেই কিছুটা দায়-বদ্ধতা তৈরি হবে আশা করা যায়।
সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বৈষম্যহীনতা বৃদ্ধি পেলে তা প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ভূমিকা রাখবে। মনে রাখতে হবে বেশি অংশগ্রহনকারী মানেই প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি নয়।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা