EU’র “Buy European” প্রস্তাবঃ সাম্ভাব্য প্রভাব ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালে ইউরোপীয় কমিশন একটি নতুন নীতি প্রস্তাব করেছে, যেটি পরিচিত হচ্ছে “Buy European” নামে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইউরোপীয় শিল্পখাতকে রক্ষা করা, স্থানীয় উৎপাদনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে (যেমন স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি) বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।
এই নীতি অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের “Buy American” বা “America First” নীতির অনুরূপ। ইউরোপীয় কমিশন মনে করছে, বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় নিজেদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি ক্রয়ে (Public Procurement) ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সুরক্ষিত বাজার তৈরি করা জরুরি।
নীতির মূল বৈশিষ্ট্য
- স্থানীয় কোম্পানির প্রতি অগ্রাধিকার: সরকারি ক্রয়ে ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের জন্য বাড়তি সুযোগ।
- গুরুত্বপূর্ণ খাতে সীমাবদ্ধতা: বিশেষত স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানি খাতে বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ সীমিত হতে পারে।
- বাজার সুরক্ষা: বাইরের দেশগুলোতে বৈষম্যমূলক নীতি চললে EU-ও তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারবে।
আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ
এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলে আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে:
- WTO’র Government Procurement Agreement (GPA) এর সঙ্গে সংঘর্ষ: WTO চুক্তি অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বৈষম্যমূলক নীতি পরিহার করতে হয়। “Buy European” নীতি সেই শর্তের বিরোধী হতে পারে।
- বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব: ইউরোপের সরকারি ক্রয়ে আগ্রহী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
- বাণিজ্য বিরোধ: যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা জাপানের মতো দেশগুলো পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উত্তেজনা বাড়াবে।
সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব
- স্থানীয় শিল্পের বিকাশ: ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো সরকারি ক্রয়ে বড় সুযোগ পাবে।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
- কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন: স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশি নির্ভরতা কমলে সংকটময় সময়ে (যেমন মহামারী) নিরাপত্তা বাড়বে।
বাংলাদেশ বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য শিক্ষণীয় দিক
- Local Preference Policy: বাংলাদেশে সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি রয়েছে। EU’র এই নতুন প্রস্তাব সেই দিকটিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরও বৈধতা দিচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক সামঞ্জস্যতা: তবে WTO নিয়মাবলি মেনে চলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্থানীয় স্বার্থ রক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধ্যবাধকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
- প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা: স্থানীয় সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি টেন্ডারে প্রতিযোগিতা ও মান নিশ্চিত করা জরুরি।
উপসংহার
একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থায় যেখানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের জন্য প্রতিযোগিতা এবং সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাড়াকাড়ি বাড়ছে, সেখানে ইউরোপের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং স্বায়ত্তশাসন উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা এবং বিকাশের ক্ষমতার উপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের “Buy European” প্রস্তাব বৈশ্বিক সরকারি ক্রয়ে একটি নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এটি স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করলেও আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ধরনের নীতি থেকে শিক্ষা নিতে পারে – কিভাবে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া যায়, একইসাথে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিও বজায় রাখা যায়।
📖 রেফারেন্স: Financial Times: Brussels pushes ‘buy European’ procurement plan
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

আউটসোর্সিং সেবা নবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
গত ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ইং তারিখে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত সেবা কর্মীদের জন্য “আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা

e-GP তে আদর্শ দরপত্র দলিল কতগুলো ? কখন কোনটি ব্যবহৃত হবে ?
বিপিপিএ কর্তৃক ই-জিপিতে অতি সম্প্রতি অনেকগুলো আদর্শ দরপত্র দলিল (STD) সংযোজন করা হয়েছে। আদর্শ দরপত্র দলিল (Standard Tender document –

International Sourcing on European Procurement: A Strategic Analysis
In its recent study, using survey data from 2021-2023, Eurostat explores a comprehensive analysis of how international sourcing is reshaping

সরকারি ক্রয়ে বিভিন্ন যানবাহনের মূল্য পূননির্ধারণ
সরকারি ক্রয়ে গাড়ি বা যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে যানবাহনের একক মূল্য পূননির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সার্কুলার জারী