ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট কী ? প্রকারভেদ, আইনি কাঠামো ও প্রয়োগ পদ্ধতি
Md. Moktar Hossain MCIPS, PMP, CPCM
Deputy Director (Xen)
Directorate of Design & Inspection-01
Bangladesh Power Development Board
Mobile: 01722044335
Email: moktar031061@gmail.com
=================================
সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বারবার দরপত্র আহ্বানের প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা নিরসন এবং উন্নততর ক্রয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট (Framework Agreement)’ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশলগত মাধ্যম। এটি মূলত এমন একটি ব্যবস্থা যা পুনরাবৃত্তিমূলক ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বোঝা কমায় এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার (Value for Money) নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়াটি প্রথাগত ক্রয় কার্যক্রম কে বিচ্ছিন্ন কতগুলো ইভেন্টের পরিবর্তে একটি সুশৃঙ্খল এবং দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বে রূপান্তর করে, যা সামগ্রিক ক্রয় প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা আনে।
ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট কী ?
নিয়মিত আবশ্যক সচরাচর ব্যবহৃত পণ্য বা সম্পাদিতব্য সাধারণ কার্য বা আবর্তক কোন ভৌত সেবা বা বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা ক্রয়ের প্রয়োজনে এক বা একাধিক ক্রয়কারী এবং এক বা একাধিক ইকোনমিক অপারেটরের মধ্যে সম্পাদিত একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিকে ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ (Framework Agreement) বলে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়মিত আবশ্যক সচরাচর ব্যবহৃত পণ্য বা সম্পাদিতব্য সাধারণ কার্য বা আবর্তক কোন ভৌত সেবা বা বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা এর একক মূল্য (Unit Price) এবং অন্যান্য শর্তাবলি নির্ধারণ করা থাকে, যাতে পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী ‘Call-off Order’ বা ক্রয়াদেশের মাধ্যমে তা গ্রহণ করা যায়।
আরও দেখুনঃ ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি’র একটি আদর্শ উদাহরণ
আইনি কাঠামো: পিপিএ-২০০৬ এবং পিপিআর-২০২৫
ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের সফল ও ত্রুটিমুক্ত বাস্তবায়নের জন্য এর আইনি কাঠামো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা ক্রয়সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য অপরিহার্য। এটি কেবল আইনি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে না, বরং চুক্তিকালীন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও সুসংহত করে।
পিপিএ-২০০৬ এর ধারা-৩৬ (১, ২, ৩):
ক্রয় সক্ষমতা: আইনের ৩৬(১) ধারা অনুযায়ী, ক্রয়কারী সচরাচর ব্যবহৃত পণ্য বা আবর্তক সেবার জন্য এক বা একাধিক দরপত্রদাতা বা পরামর্শকের সাথে এই চুক্তি করতে পারেন।
লিড এজেন্সি (Lead Agency) ও শেয়ারিং সুবিধা: আইনের ৩৬(২) ধারা একটি বিশেষ কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে। কোনো একটি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান (Lead Agency) যদি ইতোমধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সম্পাদন করে থাকে, তবে অন্য কোনো ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান নতুন করে দরপত্র আহ্বান না করেই ওই একই চুক্তির আওতায় পণ্য বা সেবা সংগ্রহের আইনগত অধিকার রাখে। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধে এবং আন্ত-সংস্থা সমন্বয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
আদর্শ দলিলের ব্যবহার: ৩৬(৩) ধারা অনুযায়ী, ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশাবলী এবং আদর্শ দরপত্র দলিল (Standard Bidding Documents) প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
পিপিআর-২০২৫ এর বিধি-১০৯ (১ ও ২):
বাস্তবায়ন কৌশল: দরপত্র আহ্বানের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মূল্য (Better Value) নিশ্চিত করতে এই চুক্তি ব্যবহৃত হয়। চুক্তির পর প্রয়োজন অনুযায়ী ‘কল-অফ’ (Call-off) নোটিশ জারির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট চুক্তি সম্পাদন নিশ্চিত করা হয়।
সময়সীমা: ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সাধারণত অনধিক ৩ (তিন) বছর মেয়াদের জন্য করা যায়।
ক্রয় পদ্ধতি: ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ (Framework Agreement) একটি চুক্তির ধরণ এটি আলাদা কোন ক্রয় পদ্ধতি নয়। বরং উন্মুক্ত (OTM) বা সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (LTM) অথবা বিশেষ ক্ষেত্রে বিধি ৯৮(১) অনুযায়ী সরাসরি চুক্তি (DPM) পদ্ধতির মাধ্যমে এক বা একাধিক ইকনোমিক অপারেটরের সাথে এই চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে।
এই আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রদান করে, যা বিভিন্ন প্রকারের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট প্রয়োগের পথ প্রশস্ত করে।
ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের প্রকারভেদ ও প্রয়োগ
প্রয়োজন অনুসারে সঠিক প্রকারের চুক্তি নির্বাচন করা ক্রয়কার্যের সফলতার প্রধান চাবিকাঠি। পিপিআর-২০২৫ এর বিধি-১০৯(৩) অনুযায়ী ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টকে নিম্নোক্ত পাঁচভাগে ভাগ করা হয়েছে:
ক) একক ইকনোমিক অপারেটরের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ চুক্তি (বিধি ১০৯(৩)(ক)): নির্দিষ্ট মেয়াদে একক সরবরাহকারীর নিকট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বা সেবার পৌনঃপুনিক সরবরাহের জন্য এই চুক্তি। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ক্রয়ের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
উদাহরণ: ১২ মাসের প্রাক্কলিত চাহিদার ভিত্তিতে ফটোকপি পেপার বা স্টেশনারি সামগ্রী ক্রয়।
খ) আনুমানিক পরিমাণ ও লিড এজেন্সি চুক্তি (বিধি ১০৯(৩)(খ)): একটি পূর্ব নির্ধারিত মেয়াদে (মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগসহ বা ছাড়া) একজন একক সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের (Single Economic Operator) সাথে চুক্তি করা হয়। এখানে ক্রয়ের পরিমাণ থাকে ‘আনুমানিক’ (Approximate), অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ থাকে না, বরং একটি ধারণা দেওয়া হয়।
লিড এজেন্সি (Lead Agency) কনসেপ্ট: যখন একাধিক সরকারি সংস্থার একই ধরণের পণ্যের প্রয়োজন হয়, তখন তারা আলাদা আলাদা টেন্ডার না করে একটি গ্রুপ গঠন করে। এই গ্রুপের মধ্য থেকে একটি সংস্থাকে ‘লিড এজেন্সি’ বা প্রধান সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। লিড এজেন্সি সবার হয়ে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত অন্য সংস্থাসমূহ সেই চুক্তির আওতায় সরাসরি ক্রয়াদেশ বা ‘কল অফ’ নোটিশ দিতে পারে।
উদাহরণ: স্টেশনারি ক্রয়ে লিড এজেন্সি মডেল: একই ভবনে অবস্থিত ৩টি ভিন্ন সরকারি অফিসের সারা বছরের জন্য প্রচুর কাগজ, কলম ও ফাইলের প্রয়োজন।
লিড এজেন্সি ও চুক্তি: অফিসগুলো নিজেদের মধ্যে একটি গ্রুপ তৈরি করল এবং ‘অফিস-ক’ কে লিড এজেন্সি (প্রধান সংস্থা) হিসেবে দায়িত্ব দিল। ‘অফিস-ক’ সবার আনুমানিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে একটি স্টেশনারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে ১ বছরের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করল।
প্রয়োগ: পরবর্তীতে, বছরের যেকোনো সময়ে ‘অফিস-খ’ বা ‘অফিস-গ’-এর যখনই কাগজ, কলম ও ফাইলের প্রয়োজন হলো, তারা নতুন করে টেন্ডার না আহবান না করে ‘অফিস-ক’ কর্তৃক করা চুক্তির সূত্র ধরে সরাসরি ওই সরবরাহকারীকে অর্ডার (কল-অফ) দিয়ে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
গ) একাধিক সরবরাহকারীর সাথে আইটেম-ভিত্তিক চুক্তি (বিধি ১০৯(৩)(গ)): নির্দিষ্ট মেয়াদে একাধিক সরবরাহকারীর নিকট থেকে বিভিন্ন আইটেমের ভিত্তিতে আনুমানিক পরিমাণ পণ্য বা সেবা সংগ্রহের চুক্তি।
এখানে সামগ্রিক লট বা প্যাকেজের ওপর ভিত্তি করে একজনের সাথে চুক্তি না করে, প্রতিটি আইটেম এর জন্য আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। অর্থাৎ, যে সরবরাহকারী যেই নির্দিষ্ট আইটেমে সেরা দর দেবেন, তাকে সেই আইটেমের জন্য নির্বাচিত করা হবে।
উদাহরণ: একটি সরকারি হাসপাতালের সারা বছরের জন্য ৩টি ভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম (Medical Consumables) যেমন: ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ, সার্জিক্যাল গ্লাভস, স্যালাইন প্রয়োজন।
প্রক্রিয়া: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিধি ১০৯(৩)(গ) অনুসরণ করে দরপত্র আহ্বান করল। ৩টি কোম্পানি দরপত্র জমা দিল: কোম্পানি A, কোম্পানি B, এবং কোম্পানি C
মূল্যায়ন: সিরিঞ্জ: কোম্পানি A সিরিঞ্জ এর জন্য সর্বনিম্ন দর দিল। কোম্পানি B গ্লাভস এর জন্য সর্বনিম্ন দর দিল। কোম্পানি C স্যালাইন এর জন্য সর্বনিম্ন দর দিল।
চুক্তি ও প্রয়োগ: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি আলাদা আলাদা আিইটেমের জন্য তিনটি কোম্পানির সাথেই ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করবে। এটিই হলো “একাধিক সরবরাহকারীর সাথে আইটেম-ভিত্তিক চুক্তি”।
-
-
- যখন সিরিঞ্জ দরকার হবে, হাসপাতাল কোম্পানি A-কে অর্ডার দেবে।
- যখন গ্লাভস দরকার হবে, হাসপাতাল কোম্পানি B -কে অর্ডার দেবে।
- যখন স্যালাইন দরকার হবে, হাসপাতাল কোম্পানি C-কে অর্ডার দেবে।
-
সুবিধা: এর ফলে প্রতিটি আইটেমের জন্য আলাদাভাবে সেরা বা সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করা যায় এবং একটি মাত্র সরবরাহকারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয় না, যা সরবরাহ ঝুঁকি (Supply Risk) কমায়।
ঘ) মিনি-কম্পিটিশন (Mini-Competition) পদ্ধতি (বিধি ১০৯(৩)(ঘ)): একাধিক সরবরাহকারীর সাথে চুক্তি করা হয় এবং ‘কল-অফ’ পর্যায়ে তাদের মধ্যে সীমিত পরিসরে প্রতিযোগিতা (Mini-Competition) এর মাধ্যমে চূড়ান্ত সরবরাহকারী নির্বাচন করা হয়।
ক্রয় প্রক্রিয়া: উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রাথমিক দরপত্র আহ্বানের পর মূল্যায়নে উত্তীর্ণ একাধিক যোগ্য সরবরাহকারীকে নিয়ে একটি ‘প্যানেল’ বা ‘পুল’ গঠন করা হয় এবং তাদের সবার সাথে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করা হয়। প্রাথমিক এগ্রিমেন্টের সময় সাধারণত একক দর বা সর্বোচ্চ সিলিং প্রাইস (Ceiling Price) নির্ধারণ করা থাকতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বা কার্যকর মূল্য নির্ধারিত হয় না।
কার্যপ্রক্রিয়া: যখনই পণ্য বা সেবার প্রয়োজন বা ‘কল অফ’ (Call-off) পর্যায় আসে, তখন এগ্রিমেন্টভুক্ত সরবরাহকারীদের মধ্যে পুনরায় দর প্রস্তাব আহ্বান করা হয়।
মূল্যায়ন ও সরবরাহ আদেশ প্রদান: সরবরাহকারীরা তখন তাদের বর্তমান বাজার দর বা সক্ষমতা অনুযায়ী প্রস্তাব দাখিল করেন। এই প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করে সেরা প্রস্তাবদাতার (সর্বনিম্ন দরদাতা বা সেরা মানের পন্য প্রস্তাবকারী) কাছ থেকে সেই নির্দিষ্ট লট বা সময়ের জন্য পণ্য বা সেবা গ্রহণ করা হয়।
সুবিধা: এটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ভেতরেও বাজারের অস্থিরতা বা মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধিকে ধারণ করতে পারে। এটি “প্রাইস লকিং” বা বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ক্রয়ের ঝুঁকি কমায় এবং কল-অফ পর্যায়েও প্রতিযোগিতা বজায় রাখে।
ঙ) সংক্ষিপ্ত মেয়াদী চুক্তি (বিধি ১০৯(৩)(ঙ)): যেখানে দীর্ঘমেয়াদী (যেমন ৩ বছর) চুক্তির প্রয়োজন নেই, বরং খুব অল্প সময়ের জন্য এক বা একাধিক আইটেম-সংবলিত অনুমিত পরিমাণ পণ্য বা সাধারণ কার্য বা ভৌতসেবা প্রয়োজন হয় তখন একক বা কতিপয় ইকোনমিক অপারেটরের সাথে সাধারণত মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ ছাড়া এধরণের চুক্তি সম্পাদন করা হয়।
উদাহরণ: মাসব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি: ধরা যাক, একটি সরকারি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ৩ মাসের জন্য একটি বিশেষ ‘ক্র্যাশ কোর্স’ বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। উক্ত প্রশিক্ষণে প্রতিদিন প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার এবং বিকেলের নাস্তা সরবরাহ করা। উল্লেখ্য যে, প্রশিক্ষণার্থীর উপস্থিতি প্রতিদিন সমান নাও হতে পারে, তাই খাবারের প্যাকেটের সংখ্যা ‘অনুমিত’ বা আনুমানিক থাকবে।
মেয়াদ: মাত্র ৩ মাস (সংক্ষিপ্ত মেয়াদ)। ৩ মাস পর কোর্স শেষ হয়ে যাবে, তাই এই চুক্তির ‘মেয়াদ বৃদ্ধির’ কোনো প্রয়োজন বা সুযোগ নেই।
সরবরাহকারী: ইনস্টিটিউট একজন ক্যাটারিং সার্ভিস প্রোভাইডারের (একক সরবরাহকারী) সাথে চুক্তি করতে পারবে যেখানে ক্যাটারিং সার্ভিস প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে চাহিদা অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করবে।
পরিবহণ সেবা ক্রয়ের সহজীকৃত ধাপ ও শর্তাবলি [বিধি ১০৯(৩)(চ)]
পরিবহণ সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সাধারণত সর্বোচ্চ ২ বছরের জন্য করা হয়। এই ক্রয়ের প্রস্তুতি ও লট তৈরির বিষয়টি নিচে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো:
ক. রুট, দূরত্ব ও লট নির্ধারণের সহজ নিয়ম:
১. কোথায় ও কীভাবে যাবে (রুট ও দর): শুরুতেই ঠিক করতে হবে মালপত্র কোন জায়গা থেকে কোন জেলায় বা অঞ্চলে যাবে। ভাড়ার হার বা দর দুটি উপায়ে ঠিক করা যেতে পারে:
- শুধুমাত্র ওজনের ওপর ভিত্তি করে (যেমন: প্রতি মেট্রিক টনের ভাড়া কত)।
- ওজন এবং দূরত্বের সমন্বয়ে (যেমন: প্রতি কিলোমিটার পথের জন্য এক মেট্রিক টনের ভাড়া কত অর্থাৎ প্রতি মেট্রিকটন- প্রতি কিলোমিটার)
২. দূরত্ব মাপার নিয়ম: দূরত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনুমানের ওপর নির্ভর করা যাবে না। মালপত্র বোঝাই করার স্থান (প্রেরণকেন্দ্র) থেকে খালাস করার স্থান (প্রাপক কেন্দ্র) পর্যন্ত রাস্তার প্রকৃত দূরত্ব কত, তা মেপে ঠিক করতে হবে। অথবা নির্দিষ্ট কোনো রুটের জন্য নির্ধারিত দূরত্বও ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. লট বা প্যাকেজ সাজানো: কাজের সুবিধার্থে ‘জেলা’ বা ‘অঞ্চল’ ভিত্তিক লট তৈরি করা ভালো। যেমন: সদর দপ্তর থেকে কোনো একটি নির্ধারিত জেলার বিভিন্ন স্থানীয় গুদামে মাল পৌঁছাতে হবে – এই ছোট ছোট গন্তব্যগুলোকে একত্র করে একটি ‘লট’ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে।
৪. মুখ্য সময় (Peak Period) ব্যবস্থাপনা: সরবরাহ তফসিলে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাণের পাশাপাশি পরিবহণের ‘মুখ্য সময়’ বা পিক পিরিয়ড উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।
খ. পরিবহণ সেবা ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়ার ফ্লোচার্ট:
একজন ক্রয়কারী কীভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবেন, তা নিচের ফ্লোচার্টে ধাপে ধাপে দেখানো হলো:
ধাপ ১: পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি : মালপত্র পরিবহণের রুট, দূরত্ব এবং পিক পিরিয়ড বা কখন চাপ বেশি থাকবে তা ঠিক করা।
ধাপ ২: দরপত্র আহ্বান : ইকোনমিক অপাটেরের যোগ্যতা হিসেবে ‘ন্যূনতম ট্রাক সংখ্যা’ ও ‘পরিবহণ ক্ষমতা’ চাওয়া হয়। বৃহৎ আইটেম পরিবহনে প্রতিযোগিতা বাড়াতে ঠিকাদারদের গ্রুপ, সাময়িক যৌথ উদ্যোগ (JV) বা ট্রাক মালিকদের সমবায় সমিতি (Cooperative Societies) গঠনে উৎসাহিত করতে হবে এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব বণ্টনের সুযোগ রাখতে হবে।
ধাপ ৩: দরপত্র জমা (দুই খাম পদ্ধতি): ইকোনমিক অপাটেরগন দুটি আলাদা খামে প্রস্তাব জমা দেবেন। কারিগরি প্রস্তাবে কারিগরী পরিকল্পনা যেমন পণ্য কীভাবে পরিবহণ করা হবে তা সহ সেবাসম্পাদনের বিস্তারিত বিবরণ, এবং আর্থিক প্রস্তাবে থাকবে ভাড়ার দর বা আর্থিক সংম্লিষ্ট বিষযাবলী।
ধাপ ৪: কারিগরি মূল্যায়ন: প্রথমে শুধু কারিগরি প্রস্তাব সমূহ মূল্যায়ন করা হবে এবং যারা কারিগরিভাবে যোগ্য বা পাস করবেন, কেবল তাদেরই পরের ধাপে নেওয়া হবে।
ধাপ ৫: আর্থিক মূল্যায়ন: কেবলমাত্র কারিগরী মূল্যায়নে যোগ্য ঠিকাদারদের আর্থিক প্রস্তাবসমুহ মূল্যায়ন করে মূল্যায়িত সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচন সহ মূল্যায়িত দরের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ ক্রমে (L1, L2, L3…) সাজানো হবে।
ধাপ ৬: বিজয়ী নির্বাচন ও চুক্তি: লট প্রতি যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা, তার সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।
প্রয়োজনে বা কোনো ঠিকাদার যদি একটি আইটেমের পূর্ণ পরিমাণ পরিবহণে সক্ষম না হয় বা অতিজরুরি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে কোনো প্রতিবন্ধকতা এড়াইবার লক্ষ্যে, ক্রয়কারী, দরপত্র দলিলে উল্লেখ থাকা সাপেক্ষে, বিধি ১২০(১) (ঙ)(ই)-এর বিধান অনুসরণক্রমে, দরপত্রদাতাগণের পর্যায়ক্রম (Ranking) অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরে পণ্য পরিবহণে সম্মত একাধিক দরপত্রদাতার সহিত চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে।
উদাহরণ: ধরুন, আপনার দপ্তর থেকে প্রতি টন মালামাল পরিবহণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ০৪ জন দরদাতা অংশ নিয়েছেন।
বিধি ১২০(১) (ঙ)(ই)-এর বিধান অনুসরণক্রমে এদেরকে যেভাবে সাজানো হবেঃ

বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা ক্রয়ে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট (বিধি- ১৩৪)
আবর্তক বুদ্ধিবৃত্তিক সেবার ক্ষেত্রে পরামর্শকের যোগ্যতাকে সেবা মূল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিধি ১৩৪(১) অনুযায়ী নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন করা যায়:
- QCBS (মান ও ব্যয়ভিত্তিক নির্বাচন)।
- পরামর্শকের যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন (CQS)।
- সামাজিক সেবামূলক সংগঠন নির্বাচন পদ্ধতি (Selection of Social Service Organizations)।
- ব্যক্তিভিত্তিক পরামর্শক নির্বাচন পদ্ধতি।
এক্ষেত্রে মূলত বিধি ১০৯(৩)(খ)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ ও চুক্তির কাঠামো তৈরি করা হয়।
পরিশেষ
ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্ব এবং গতিশীলতা আনয়নের একটি প্রধান অনুঘটক। এটি কেবল সময়ই সাশ্রয় করে না, বরং ইকোনমিক অপারেটরগনের সাথে একটি টেকসই আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। পিপিএ-২০০৬ এবং পিপিআর-২০২৫ এর বিধানগুলোর যথাযথ অনুসরণ এবং ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের কৌশলগত প্রয়োগ বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ইকোসিস্টেমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং বিশ্বমানের করে তুলতে পারে।
ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সংক্রান্ত আরও Post দেখুনঃ
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা
Md. Moktar Hossain MCIPS, PMP, CPCM Deputy Director (Xen) Directorate of Design & Inspection-01 Bangladesh Power Development Board Mobile: 01722044335 Email:

সরকারি ক্রয়ের আয়নাঃ ক্রয় প্রক্রিয়া-উত্তর পুনরীক্ষণ
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় অগ্রাধিকারঃ বিধিমালা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

PPR-2025: এক নজরে সকল ক্রয় সংশ্লিষ্ট কমিটি
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com