তেলের কারচুপি ফাঁসঃ অভ্যন্তরীণ অডিটিং এর গূরুত্ব
MD MARUF BILLAH
Assistant Manager Internal Audit
JAMUNA GROUP
Expert in Internal audit & control, Fraud Investigations, Financial Controls, etc.
৫০ বছর ধরে চলা তেলের কারচুপি ফাঁস!
আমাদের কোম্পানিতে প্রতিদিন কোন এক কোম্পানি থেকে গাড়িতে ৯,০০০ লিটার তেল সরবরাহ করা হতো। তারা তেল মাপার জন্য ড্রপ স্টিক ব্যবহার করত এবং ১,০০০ লিটারের অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমযুক্ত ড্রামে তেল ভরতো। কিন্তু বিষয়টি আমি প্রথম থেকেই সন্দেহ করছিলাম, কারণ প্রতি ড্রামে মাত্র ৯০০ লিটার তেল দিয়েই তারা দাবি করতো যে ১,০০০ লিটার পূর্ণ হয়ে গেছে! অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, এই ড্রামের সম্পূর্ণ ধারণক্ষমতা ১,০০০ লিটার হলে ৯০০ লিটারেই তা পরিপূর্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম, কিন্তু কোনো সুস্পষ্ট কারচুপি ধরা যাচ্ছিল না। স্টোর, সিকিউরিটি এবং অডিট টিমের লোকজনও সরাসরি ডিপোতে গিয়ে তেল বুঝে আনতো, তারপরও প্রতিদিনের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতা মিলছিল না। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এমনই চলছিল!
একদিন আমি সরাসরি গাড়ির নিচে ঢুকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনই চোখে পড়ে এক অবিশ্বাস্য কারসাজি! আমি দেখলাম—গাড়ির পিছনের চাকায় ইউ-বোল্টের নাটের পাশে একটি লুকানো পাইপলাইন রয়েছে, যা ডিফেনশিয়ালের উপর দিয়ে সামনে চলে গেছে এবং ড্রাইভারের পায়ের নিচে এসে একটি গোপন সুইচের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। যখন তেল মাপা শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়া হতো, তখন ড্রাইভার এই সুইচ চালু করত, আর ওই লুকানো পাইপের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ লিটার তেল সরাসরি তাদের সার্ভিস ট্যাংকে চলে যেত!
এই প্রতারণা এত নিখুঁতভাবে করা হয়েছিল যে, সাধারণভাবে কেউ বুঝতে পারত না। এটি ছিল সুপরিকল্পিত একটি কৌশল, যা বছরের পর বছর ধরে আমাদের কোম্পানিকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছিল।
আমি সমস্ত প্রমাণসহ বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করি। হেড অফিস তাৎক্ষণিক তদন্ত করে উক্ত কোম্পানিকে ১৩,৬৫,০০০ টাকা জরিমানা করে এবং তাদের সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। পরে আমরা নতুন একটি কোম্পানির কাছ থেকে তেল নেওয়া শুরু করি, তখন দেখা গেল প্রতিদিন ১,০০০ লিটার বেশি তেল আসছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১,০৫,০০০ টাকা! অর্থাৎ, এতদিন ধরে আমাদের কোম্পানি প্রতিদিন লাখ টাকা ক্ষতির শিকার হচ্ছিল!
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী অডিটিং ব্যবস্থা থাকলে যে কোনো অনিয়ম ধরা সম্ভব। শুধু নিয়মকানুন মেনে চলা যথেষ্ট নয়, বরং একজন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকের উচিত সব বিষয়ের গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা। কারণ, একটি ছোট ভুল বছরের পর বছর বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিঃদ্রঃ ঘটনাটি সরাসরি আমি মোঃ মারুফ বিল্লাহর নিজ হাতে প্রমানিত।
আরও দেখুনঃ অধিদপ্তর পর্যায়ে স্বতন্ত্র অভ্যন্তরীণ অডিটিং চালু