রিভিউ প্যানেলে আগত অভিযোগ এবং সিদ্ধান্ত ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত রাখা উচিত
রিভিউ প্যানেল সিদ্ধান্ত প্রদানের পর, আপীলে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রদত্ত সিদ্ধান্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার উচিত। বিষয়টিতে ক্রয়কারি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সহ অনেকেরই যথেষ্ট আগ্রহ আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিপিপিএ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিভিউ প্যানেলের একটি সিদ্ধান্তের স্ক্রিনশট নিচে দেয়া হলো –

বিপিপিএ’র ওয়েবসাইটে উপরোক্ত রিভিউ পিটিশনের শুধুমাত্র ১টি পাতা প্রকাশিত হয়েছে। এই ১টি পাতায় শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত অংশটুকু দেখে রিভিউ পিটিশনের পুরো চিত্র বোঝা অসম্ভব। বরং তা অনেকক্ষেত্রে ক্রয়কারি বা ঠিকাদারদের ভূল বা বিভ্রান্তিকর সংকেত দিতে পারে।
রিভিউ প্যানেলের রায়গুলোর গুরুত্ব
দেশের সরকারি ক্রয় কার্যক্রম (Public Procurement) একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ, যেখানে বিপুল পরিমাণ জনঅর্থ ব্যয় হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে অভিযোগ ও আপিল ব্যবস্থা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে। এই সুরক্ষা বলয়ের চূড়ান্ত স্তর হলো রিভিউ প্যানেল (Review Panel)।
ক্রয়কারী সত্তার দায়িত্ব লঙ্ঘন, অবহেলা, ইত্যাদি বিবিধ কারনে যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ক্ষতির যৌক্তিক আশঙ্কা থাকলে অভিযোগ দাখিল করতে পারে (PPA 2006, ধারা 29)। ধারাবাহিক ভাবে কয়েকটি স্তরে অভিযোগ করার পর সর্বশেষ রিভিউ প্যানেলে আপীল করতে হয়। পিপিআর ২০২৫ এর বিধি ৭৩ তে এবিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ, সাবেক সিপিটিইউ) রিভিউ প্যানেলের কার্যক্রম পরিচালনায় অনুসরণীয় একটি কার্যপদ্ধতি জারি করেছে।
বিস্তারিত দেখুনঃ রিভিউ প্যানেল (Review Panel) কার্যক্রমে অনুসরণীয় কার্যপদ্ধতি
পিপিআর ২০২৫ এর বিধি ৭৬(৬) এবং এই কার্যপদ্ধতিতে বলা আছে রিভিউ প্যানেলে অভিযোগ দাখিলের পর প্যানেলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে উক্ত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই রিভিউ প্যানেলের রায়গুলোর গূরুত্ব আছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে প্রতি বছরই এই রিভিউ প্যানেলে আগত অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রিভিউ প্যানেলে আগত অভিযোগের সংখ্যা কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার। একই রকম বিষয়ে কি বার বার অভিযোগ দাখিল হচ্ছে ? একই বিষয়ে কি বিভিন্ন প্যানেল বিভিন্ন রকম রায় দিচ্ছে ? রিভিউ প্যানেলের রায় নিয়ে অংশগ্রহনকারি পক্ষ বা জনসাধারনের মধ্যে প্রতিক্রিয়া কি ? সব পক্ষই কি সন্তুষ্ট ? রিভিউ প্যানেলে উপর আস্থা কি বাড়ছে ?
সিদ্ধান্তসমূহ উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা
বিধিতে উল্লেখ আছে, অবিলম্বে আপিলে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রদত্ত সিদ্ধান্ত সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, যদি না তা –
(ক) কোনো আইনের পরিপন্থি হয়;
(খ) কোনো আইনের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে;
(গ) জনস্বার্থের পরিপন্থি হয়;
(ঘ) পক্ষবৃন্দের আইনানুগ ব্যবসায়িক স্বার্থকে বিঘ্নিত করে; বা
(ঙ) ক্রয়কার্যের অবাধ প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
কিন্তু, রিভিউ প্যানেলের কার্যক্রম পরিচালনায় অনুসরণীয় কার্যপদ্ধতি অনুযায়ি রিভিউ প্যানেলের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সর্বসাধারণের প্রাপ্তির জন্য উন্মুক্ত করা যাবে না এবং তবে, শুধু সিদ্ধান্ত সংক্ষিপ্ত আকারে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য বিপিপিএ’র Website – ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা যাবে।
রিভিউ প্যানেলের দায়িত্ব ও কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের সুবিধার্থে বিপিপিএ কে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করতে হয়। সে অনুযায়ি বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্ত Follow-up করবে।
এখানে দেখা যাচ্ছে, রিভিউ প্যানেলে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রদত্ত সিদ্ধান্ত উভয়ই প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিপিপিএ কর্তৃক সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে, রিভিউ প্যানেলের কার্যক্রম পরিচালনায় অনুসরণীয় কার্যপদ্ধতিতে শুধু সিদ্ধান্ত অংশটুকুই সংক্ষিপ্ত আকারে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য বিপিপিএ’র Website এ প্রকাশ করার উল্লেখ আছে।
এখানে, “সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা” বলতে কি বোঝাচ্ছে তা পরিষ্কার করা হয়নি। আবার “শুধু সিদ্ধান্ত অংশটুকুই সংক্ষিপ্ত আকারে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য বিপিপিএ’র Website – এ প্রকাশ করা যাবে” অংশটুকুর মাধ্যমে আসলে বিষয়টিকে সংকীর্ণ করে ফেলা হয়েছে। কোন অভিযোগের আপিলে উত্থাপিত বিষয়বস্তু এবং পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত না জানতে পারলে আগ্রহি জনসাধারনের এতে কি উপকার হবে তা নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
রিভিউ প্যানেলের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক প্রকাশের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি না হয় ঠিক আছে, কিন্তু মূল অভিযোগটি কি এবং কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে তার একটি সার-সংক্ষেপ অবশ্যই প্রকাশ করা উচিত। না হলে সিদ্ধান্ত অংশটুকু শুধুমাত্র কাগুজে রিপোর্ট হয়েই থাকবে। এইটুকু পড়ে নিরপেক্ষ ভাবে নতুন কেউই প্রকৃত বিষয় উপলব্ধি করতে পারবে বলে মনে হয় না।
বর্তমানে বিপিপিএ তাদের ওয়েবসাইটে শুধুমাত্র সিদ্ধান্তের সার-সংক্ষেপ প্রকাশ করছে। কিন্তু অভিযোগের বিষয়বস্তু এবং পূর্ণাঙ্গ রায় না জানতে পারলে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ রায় না হোক, অন্তত পূর্ণাঙ্গ রায়ের সার-সংক্ষেপ না জানলে প্রকৃত ঘটনা ও রায়ের ভিত্তি উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত
কোর্ট অব জাস্টিস (Court of Justice of the European Union – CJEU) হলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ আদালত। এই CJEU-এর সরকারি ক্রয় (public procurement) সংক্রান্ত রায়গুলো সাধারণত গোপনীয় নয়। বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচারব্যবস্থায় “transparency” বা স্বচ্ছতা একটি মৌলিক নীতি। তাই অধিকাংশ procurement-related judgment, opinion, order ও hearing সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়।
রায়ের প্রায় সাথে সাথেই আদালতের নিজস্ব অফিসিয়াল ওয়েবসাইট CURIA Case-law Database-এ রায়গুলো ডিজিটালভাবে আপলোড করা হয় এবং এগুলো ইইউ’র সব দাপ্তরিক ভাষায় অনুবাদের নিয়ম রয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে, যেমন, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার (Data Privacy) জন্য রায়ের কিছু অংশ সংশোধন বা আড়াল করা হয়ে থাকে।
রায় সংক্রান্ত প্রকাশিত ডকুমেন্টের মধ্যে থাকে:
- Judgments (চূড়ান্ত রায়)
- Advocate General’s Opinion
- Orders
- Hearing Information
- Parties’ Written Observations
এভাবে রায়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে ভাড়ে জড়িত এই অংশগুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে অন্যান্য ক্রয়কারি এবং দরদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভবিষ্যৎ সংশ্লিষ্ট ভুলভ্রান্তি নিয়ে আরও সতর্ক হওয়া সুযোগ পায়।
পরিশেষ
সংক্ষেপে, মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনো গোপন নথিপত্র সুরক্ষিত রাখা হলেও, আদালত যে চূড়ান্ত রায় প্রদান করে, তা সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সর্বসাধারণের জন্য যতোটা সম্ভব উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।
সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে রিভিউ প্যানেল যে রায় প্রদান করে, তা কেবল সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য নয় বরং পুরো ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক চর্চার আদলে আমাদের দেশেও রিভিউ প্যানেলের চূড়ান্ত রায়গুলো সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা উচিত। রিভিউ প্যানেলের কার্যক্রম পরিচালনায় অনুসরণীয় কার্যপদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছতা ভিত্তিক করা প্রয়োজন।
এটি কেবল জবাবদিহিতা বৃদ্ধিই করবে না, বরং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থাও বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা