রেট সিডিউল বই একটাই হওয়া উচিত
বিধি অনুযায়ি ক্রয়কারী কর্তৃক নিজ এবং অন্য ক্রয়কারীর প্রতিনিধিসহ ৩ (তিন) জন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রথমে প্রাক্কলন প্রস্তুত করবে। তারপর তা অনুমোদনকারী (বা প্রয়োজ্য) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদন করবেন। সুতরাং শুধুমাত্র ব্যক্তি হিসেবেই অন্তত ৪ জন এই প্রাক্কলন প্রস্তুতির সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে এবং বিধি অনুযায়ি জড়িত। সিভিল ওয়ার্কসের সাথে জড়িত কর্মকর্তাগন মাত্রই জানেন সড়ক, দালান, ব্রীজ, ইত্যাদি সহ ইলেক্ট্রিক্যাল কার্যের দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুত আসলেই কতটা সময় সাপেক্ষ। প্রতি বছরে দেশে শুধু সিভিল ওয়ার্কসেরই প্রায় চল্লিশ হাজারের বেশি দরপত্র আহবান করতে হয়। এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এখন এই দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুতির কোন বিশেষ নির্দেশনা বা ইউনিক সিস্টেম না থাকায় সবাই বিড়ম্বনার স্বীকার হচ্ছে।
একক রেট সিডিউল প্রয়োজন
এই দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় (official cost estimate) প্রস্তুতের জন্য বিভিন্ন দপ্তর তাদের নিজস্ব বিধি-বিধান অনুসরণ করে প্রস্তুত করে থাকে। এ ক্ষেত্রে সাধারনত রেট সিডিউল বই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু সমস্যা হল এই রেট সিডিউল বই আবার বিভিন্ন দপ্তরের জন্য বিভিন্ন রকম। যে যার মত করে প্রস্তুত করে ব্যবহার করছে। তবে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের রেট সিডিউল বই। এটি সময়ে সময়ে গণপূর্ত ই/এম ইউনিট থেকে প্রকাশ করা হয়। একটি নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে গণপূর্ত বিভাগ ছাড়াও অনান্য সরকারী, আধা-সরকারী অথবা বেসরকারী নির্মাতারা এটি ব্যবহার করে থাকে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রস্তুতকৃত রেট সিডিউল বই সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহ ব্যবহার করে থাকে।সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরও তাদের নিজস্ব রেট সিডিউল ব্যবহার করে।
এখনও ভিন্ন ভিন্ন রেট সিডিউলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। রেট সিডিউল ভিন্ন হওয়ার কারণে অনেক সময় প্রকল্প ব্যায়েও ভিন্নতা দেখা দেয়। গড়মিল দেখা দেয় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ক্রয়েও। সমন্বিত রেট সিডিউল না হলে অনেক সময় প্রকল্প ব্যয়ে ভিন্নতা দেখা দেয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে একই সরঞ্জাম কিনতে এলজিইডির ঠিকাদাররা অনেক সময় বলেন, পিডাব্লিউডির ঠিকাদাররা অধিক টাকা দিচ্ছেন। সমন্বিত রেট সিডিউল ঘোষণা করলে কেউ বাড়তি ব্যয় দাবি করতে পারবে না। এতে প্রকল্প ব্যয়ও কমে আসবে। কেউ বাড়তি সুবিধাও নিতে পারবে না। সমন্বিত রেট সিডিউল তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়ন হয় নাই।
রিপোর্ট-১ঃ রেট সিডিউল তৈরির জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর।
রিপোর্ট-২ঃ সরকারি প্রকল্পে সমন্বিত রেট সিডিউলের নির্দেশ
সিপিটিইউ এর মহাপরিচালক মহোদয় নিজেও এ নিয়ে তার বক্তব্য বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এর সমাধানের বিষয়ে তেমন কোন নির্দেশনা তার বক্তব্য থেকে পাওয়া যায় নি। উদাহরণ স্বরূপ গত ৩০ শে মার্চ ২০১৭ তারিখের তার একটি বক্তব্য তুলে ধরা যেতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা হিসাবে কাজ করছে। ১৯৭৪ সালে আগষ্ট মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ৪টি পরিসংখ্যান অফিস (পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি শুমারি কমিশন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন আদমশুমারি কমিশন)-কে একীভূত করে সৃষ্টি করা হয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। তারপর ২০১০ সালে পরিসংখ্যান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আবার ২০১২ সালে নাম পরিবর্তন করে Statistics & Informatics Division রাখা হয়। ২০১৩ সালে পরিসংখ্যান আইন করা হয়। আইনেই সব আছে।
পরিসংখ্যান আইন, ২০১৩
৬ নং ধারাঃ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ব্যুরোর কার্যাবলী হইবে নিম্নরুপ, যথা:-
(ক) সঠিক, নির্ভুল ও সময়োপযোগী পরিসংখ্যান প্রণয়ন ও সংরক্ষণ;
(ঘ) ব্যবহারকারীগণের চাহিদা অনুসারে দ্রুততার সহিত নির্ভরযোগ্য এবং ব্যবহারবান্ধব পরিসংখ্যান সরবরাহকরণ;
(ঞ)পরিসংখ্যান কার্যক্রম সম্পাদনে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ;
(ট) যে কোন কর্তৃপক্ষ, পরামর্শ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে পরিসংখ্যান বিষয়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রদান;
(ঠ) ভোক্তার মূল্য-সূচকসহ অন্যান্য মূল্য-সূচক এবং জাতীয় হিসাব প্রস্তুতকরণ;
(দ) পরিসংখ্যানের প্রধান প্রধান কার্যক্রমসমূহ আন্তর্জাতিক মানে প্রমিতকরণ (standardization);
প্রতি মাসের বাজার মূল্য এবং মজুরী প্রকাশ করা হয় (Consumer Price Index (CPI), Inflation Rate and Wage Rate Index (WRI))। কিন্তু তা সময় মত প্রকাশ করা হয় না। যেমন মার্চ ২০১৭ সালের রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয় নাই। অনলাইন ডাটাবেজ এখনও হয় নাই।
পরিশেষঃ
বাংলাদেশে সরকারী ক্রয়ে মূল্য তালিকা ও দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণের বেহাল দশা-ই কি সরকারী ক্রয়ে আজকের এই হ-য-ব-র-ল অবস্থার জন্য দায়ী নয় ? দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে একদিনে শুধু লুকোচুরি আরেকদিনে এর কাড়াকাড়ি’র ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য সাধারণ ব্যবহারকারীরা-ই শুধু ভূক্তভোগী হচ্ছেন না, বরং সকল প্রকল্পের অগ্রগরিত উপর-ই প্রচ্ছন্ন প্রভাব পড়ছে।
দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুত অবশ্যই Standardize হতে হবে, সঠিক ভাবে হচ্ছে কিনা তা তদারকি করার একটা Tool বের করতে হবে। সর্বপরি, Statistics & Informatics Division এর সহযোগিতায় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি একক দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রস্তুতের গাইড-লাইন প্রস্তুত করা প্রয়োজন। অন্যথায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ এর মূলনীতিতে যা বলা হয়েছে তা পুরোপুরি ভূলুন্ঠিত হয়ে যাবে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ এর মূলনীতি
১। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা,
২। ক্রয়কার্যে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক সকল ব্যক্তির প্রতি সম-আচরণ,
৩। অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা,
৪। অনুসরণীয় পদ্ধতি নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করা”।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

Collusion in the Belgian Newspaper Distribution Sector
The Belgian competition authority has concluded its formal inquiry into systemic bid-rigging and horizontal agreements within the public procurement process

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক

সরকারি ক্রয়ে রেকর্ড ব্যবস্থাপনাঃ আইনি কাঠামো ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

লাম্প সাম নাকি টাইম-বেসড কন্ট্রাক্ট – কোনটি কখন ব্যবহার করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ে প্রধানত কাজের ধরন ও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হয়।