USAID’র সহায়তা বন্ধঃ প্রকিউরমেন্টে জড়িত সব পক্ষের জন্য কি বার্তা
পুরো বিষয়টা বুঝে উঠার আগে ইউএসএইড (USAID) এর ওয়েবসাইট টা দেখতে ঢু মারলাম। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা “USAID বাংলাদেশ” এর “Country Overview” টা এরকম”
“বাংলাদেশে USAID’র কর্মসূচি এশিয়ার বৃহত্তম, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচি ছাড়াও রয়েছে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্র ও সুশাসন, মৌলিক শিক্ষা এবং পরিবেশগত, ইত্যাদি কার্যক্রম। USAID রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশে বৃহৎ মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার হিসেবে, ইউএসএআইডি ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যাত্রায় সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।“
এখনকার খবর হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইড (USAID) এর অর্থায়নে বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন সব প্রকল্প ও কর্মসূচির ব্যয় অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৬ জানুয়ারি) ইউএসএইড, বাংলাদেশ কার্যালয় হতে সংস্থাটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ সব স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠনের জন্য এ নির্দেশনা জারি করে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নির্দেশনায় USAID বাংলাদেশে চলমান চুক্তি, কার্যাদেশ, অনুদান, সমন্বিত চুক্তি বা অন্যান্য অধিগ্রহণ বা সহায়তা সরঞ্জাম অধীনে করা সব কাজ অবিলম্বে বন্ধ, থামানো বা স্থগিত করা হয়েছে।
এতে অংশীদারদের সঙ্গে যেসব কাজ চলছে সেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচনের জন্য সব যুক্তিসংগত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই না, চিঠিতে USAID’র অর্থায়নে চলমান সব প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে মর্মে নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্যও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মার্কিন সরকার ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে উন্নয়ন খাতে প্রায় ৪৯০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে, USAID উন্নয়ন লক্ষ্য অনুদান চুক্তি (Development Objective Grant Agreement: DOAG) এর অংশ হিসেবে ২০২.২৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং বর্তমানে প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নির্দেশনা অনুযায়ি বিভিন্ন ক্রয় চুক্তিতে নিয়োজিত ঠিকাদার, পরামর্শক, এনজিওদের কি হবে ? চলমান চুক্তিগুলোতে কি প্রভাব পড়বে ?
উপরের চিঠিটি USAID/Bangladesh-এর সাথে কাজ করা সকল Implementing Partners (ঠিকাদার, পরামর্শক, বা সহযোগী সংস্থা) কে তাদের চলমান কাজগুলি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ বা স্থগিত করার নির্দেশ দিচ্ছে। এই নির্দেশটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশ (Executive Order) এবং USAID-এর নিজস্ব নিয়মাবলী (যেমন FAR Clause 52.242-15, 2 CFR 700.14) অনুসারে জারি করা হয়েছে।
আরও দেখুনঃ তিস্তার পানি বন্টন সমস্যা সমাধানে গেম থিউরি’র প্রয়োগ
চলমান চুক্তিগুলোতে এর প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ও রীতি-নীতি অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
চুক্তির স্থগিতাদেশ (Suspension of Contracts):
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সকল Implementing Partners কে তাদের USAID/Bangladesh-এর অধীনে চলমান চুক্তি, টাস্ক অর্ডার, গ্রান্ট বা সহযোগিতা চুক্তির কাজগুলি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করতে হবে। এটি একটি Stop-Work Order (কাজ বন্ধের আদেশ) হিসাবে বিবেচিত হবে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি আইন (International Contract Law) অনুযায়ী Stop-Work Order একটি আইনগতভাবে বৈধ পদক্ষেপ, যা চুক্তির শর্তাবলীর অধীনে সরকার বা চুক্তিদাতা সংস্থা কর্তৃক জারি করা যেতে পারে। এটি সাধারণত চুক্তির ধারা 52.242-15 (FAR Clause) বা অনুরূপ ধারার অধীনে প্রযোজ্য হয়।
এই আদেশের ফলে ঠিকাদার বা পরামর্শকদের কাজ বন্ধ করতে হবে এবং চুক্তির অধীনে নতুন কোনো খরচ বা বিনিয়োগ করা যাবে না। তবে, চুক্তি বাতিল করা হয়নি, শুধুমাত্র স্থগিত করা হয়েছে।
খরচ ন্যূনতমকরণ (Minimization of Costs):
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, Partners কে তাদের চুক্তির অধীনে খরচ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ রীতি, যেখানে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল হলে ঠিকাদার বা পরামর্শকদের অতিরিক্ত খরচ এড়ানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
চুক্তি পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া (Resumption of Work):
চিঠিতে বলা হয়েছে যে, কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য USAID-এর Contracting/Agreement Officer এর কাছ থেকে লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। এটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে চুক্তি স্থগিতাদেশের পর পুনরায় কাজ শুরু করতে চুক্তিদাতা সংস্থার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
প্রশ্ন ও পরামর্শ (Questions and Guidance):
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আদেশ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন আসতে পারে এবং USAID এ বিষয়ে শীঘ্রই পরবর্তী নির্দেশনা প্রদান করবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চুক্তিদাতা সংস্থা চুক্তিগ্রহীতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে এবং নির্দেশনা প্রদান করবে।
আরও দেখুনঃ প্রকিউরমেন্টে লুকানো বা অজ্ঞাত খরচ
পরিশেষ
তবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা দাতা সংস্থাগুলোর জন্য এ ধরনের নির্দেশনা বা পদক্ষেপ একেবারেই নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংক কেনিয়ার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থগিত করেছিল, কারণ স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে পরামর্শ না করার অভিযোগ উঠেছিল।
তবে বাংলাদেশে USAID এর কার্যক্রম হঠাৎ স্থগিত হওয়া ভাল খবর নয়। বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশে বিদেশি সহায়তা এমনিতেই কমে গিয়েছে।
এই চিঠিটি USAID/Bangladesh-এর সাথে কাজ করা সকল ঠিকাদার, পরামর্শক, এবং সহযোগী সংস্থাগুলোকে তাদের চলমান কাজগুলি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ বা স্থগিত করার নির্দেশ দিচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং USAID-এর অভ্যন্তরীণ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চুক্তিগুলো স্থগিত করা হয়েছে, তবে বাতিল করা হয়নি। কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য USAID-এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
তবে জানা গেছে USAID/Bangladesh তাদের চলমান সব প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ অথবা স্থগিতের নির্দেশ দিলেও বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য দেওয়া খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা কার্যক্রম এই স্থগিতাদেশের বাইরে থাকবে। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জন্য দেওয়া খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা কার্যক্রম চলবে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

European Industrial Law: A master plan to build ‘Made in Europe’ with a procurement power of €2 Trillion
The forthcoming Industrial Accelerator Act, slated for publication on February 26, marks a watershed moment in the European Union’s pursuit

ইউরোপীয় শিল্প আইন: ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর প্রকিউরমেন্ট শক্তিতে ‘মেইড ইন ইউরোপ’ গড়ার মহাপরিকল্পনা
ইউরোপীয় কমিশন আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিলারেটর অ্যাক্ট’ (Industrial Accelerator Act) নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়া প্রস্তাব পেশ করতে

Collusion in the Belgian Newspaper Distribution Sector
The Belgian competition authority has concluded its formal inquiry into systemic bid-rigging and horizontal agreements within the public procurement process

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক