ট্রাম্পের ‘Buy American’ নীতি এবং সরকারি ক্রয়
হোয়াইট হাউস ৩ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে বাণিজ্য নীতি বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন (Executive summary of a (non-public) comprehensive report to the President on trade policy) প্রকাশ করেছে, যেখানে সরকারি ক্রয়ে “Buy American” নীতিও অন্তর্ভুক্ত আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই রিপোর্টটি নিয়ে আলোচনা কম হচ্ছে। প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির প্রতিফলন ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরকারি ক্রয় নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রেসিডেন্টের ২০ জানুয়ারী জারি করা আমেরিকা ফার্স্ট ট্রেড পলিসি’র প্রতিক্রিয়ায় এই বিস্তৃত প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে এখানে শুধুমাত্র একটি নির্বাহী সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে, সম্পূর্ণ প্রতিবেদন নয়।
প্রতিবেদনটির ২৪টি অধ্যায়ের মধ্যে ২টি তে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
রিপোর্টটিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সরকারি ক্রয় চুক্তি (GPA) এর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে অগ্রসর হতে পারে, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এর একটি সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
আরও পড়ুনঃ ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপে আন্তর্জাতিক বানিজ্য এবং সাপ্লাই-চেইনে এর প্রভাব
President on trade policy
হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে সরকারি ক্রয়ে “Buy American” নীতিকে “common sense” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সুরক্ষা নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির একটি “ধারালো বিচ্যুতি” (Protectionism in procurement marks a sharp departure from post-war U.S. trade policy)।
প্রতিবেদনে ডব্লিউটিও সরকারি ক্রয় চুক্তি (GPA: Government Procurement Agreement) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও প্রতিবেদনে GPA নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে, তবে কার্যত এমন মনে করা হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত GPA থেকে হঠাৎ করে নিজেকে প্রত্যাহার করবে না, অন্তত প্রথমে চুক্তির শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করার চেষ্টা করবে।
হোয়াইট হাউস রিপোর্টে একটি ২০১৯ সালের গভর্মেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস (GAO)-এর প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলেছে যে ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র GPA এর অধীনে ৮৩৭ বিলিয়ন ডলারের ক্রয় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা পরবর্তী পাঁচটি বৃহত্তম GPA স্বাক্ষরকারী দেশ (EU, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়ে এবং কানাডা) এর সম্মিলিত ৩৮১ বিলিয়ন ডলারের দ্বিগুণেরও বেশি। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রীয় ক্রয়ের বাজারে বৈদেশিক সরবরাহকারীদের জন্য বৃহত্তর সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে, প্রতিবেদনে “পারস্পরিক” সুবিধার অভাব নিয়ে বিতর্ক তোলা হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র GPA এর অধীনে বিদেশি বিক্রেতাদের জন্য বৃহত্তর বাজার উন্মুক্ত করে, ২০১৫ সালে বাস্তবে বিদেশি বিক্রেতাদের কাছে যাওয়া ফেডারেল ক্রয়ের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ইউরোপীয় কমিশন অবশ্য সরকারি ক্রয়ের বাজারে সরাসরি ও পরোক্ষ প্রবেশাধিকারের ভিন্ন পদ্ধতির কথা বলেছে, যেখানে তাদের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো EU সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরকারি ক্রয় বাজারে বেশি সুবিধা ভোগ করে।
২০২৪ সালে, ইউরোপীয় কমিশন FSR (Foreign Subsidies Regulation) এর অধীনে তিনটি তদন্ত করেছিল যেখানে তার ‘পর্যাপ্ত ইঙ্গিত’ ছিল যে ইইউ পাবলিক প্রকিউরমেন্টে চীনা সংস্থাগুলির দরপত্র বিদেশী ভর্তুকি থেকে লাভবান হয়েছে।
হোয়াইট হাউস রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে কিছু GPA অংশীদার তৃতীয় দেশকেও তাদের ক্রয় বাজার উন্মুক্ত করে, যার ফলে মার্কিন সরবরাহকারীদের তাদের অর্জিত অগ্রাধিকারমূলক বাজারগুলিতে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। এই “পারস্পরিকতার অভাব” এবং “অন্যায্য প্রতিযোগিতা” মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র GPA সংশোধন বা Re-negotiate করতে পারে এবং যদি তা সফল না হয়, তবে প্রত্যাহারও করতে পারে।
GPA এর Re-negotiate চুক্তির অন্তর্ভূক্ত হলেও এটি দীর্ঘ সময় নিতে পারে। অন্যদিকে, GPA থেকে প্রত্যাহার করা কঠিন হতে পারে, কারণ কানাডা আঞ্চলিক USMCA চুক্তির সরকারি ক্রয় চ্যাপ্টারে যোগদান করেনি এবং GPA থেকে বেরিয়ে গেলে কানাডার সরকারি ক্রয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের প্রবেশাধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
হোয়াইট হাউস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে GPA অংশীদারদের তৃতীয় পক্ষের (যেমন চীন, যারা GPA-এর সদস্য নয়) বাজারে প্রবেশে বাধা দেয় না, যা যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত GPA-এর এই দিকটি পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে, যদিও GPA-তে এই ধরনের পরিবর্তন আনাও বিতর্কিত হতে পারে।
সারসংক্ষেপ
বাণিজ্য ঘাটতির পর্যালোচনা
প্রশাসনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির কারণগুলি তদন্ত করছে এবং সম্ভাব্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে, যেমন বিশ্বব্যাপী সম্পূরক শুল্ক আরোপ।
বাণিজ্য চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন
সমস্ত বাণিজ্য চুক্তি, বিশেষ করে WTO GPA, পুনর্মূল্যায়ন করে সেগুলি আমেরিকান শ্রমিক ও উৎপাদকদের পক্ষে উপযোগী কিনা তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা
বিদেশী বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কারণে সৃষ্ট জাতীয় জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় প্রতিক্রিয়াশীল শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা আমেরিকান শ্রমিকদের সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
সম্ভাব্য পদক্ষেপ:
শুল্ক আরোপ:
বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস ও আমেরিকান শিল্পকে সুরক্ষা দিতে প্রশাসনটি বিভিন্ন দেশের উপর প্রতিক্রিয়াশীল শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশটি হলো যুক্তরাষ্ট্রকে ডব্লিউটিও সরকারি ক্রয় চুক্তি (GPA) সংশোধন বা পুনঃআলোচনা করতে হবে অথবা, “যদি অসফল হয়, প্রত্যাহার করতে হবে”। তবে, প্রতিবেদনের সুপারিশগুলি বাস্তবায়নের জন্য কোনও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
সুতরাং, প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত GPA-এর ক্ষেত্রে মূলত পুনঃআলোচনা এবং পারস্পরিকতার অভাব দূর করার উপর জোর দিতে পারে। যদি এই প্রচেষ্টা সফল না হয়, তখন, যুক্তরাষ্ট্র GPA থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার পথও বিবেচনা করতে পারে। তবে, হঠাৎ করে প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।
Source: President Trump and Buy American — The Overlooked Report
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

বাংলাদেশে ADP বাস্তবায়ন ৫ বছরের সর্বনিম্ন: Procurement Delay কি আসল কারণ ?
বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme–ADP) দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান আর্থিক

বাংলাদেশে Manual Tender যুগের সমাপ্তিঃ বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ১ জুলাই ২০২৬ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এদিন থেকে Manual (Offline) Tendering-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং সরকারি

Indirect Procurement 2026 Report: Uncertainty as a Catalyst for Efficiency
The year 2026 is an extremely challenging and transformative year for procurement professionals. According to the 9th Annual Indirect Procurement

সরকারি Procurement System-এ আরও পরিবর্তন আসছে
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ই-জিপি (e-GP) চালুর ফলে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা