Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সরকারি ক্রয়ে সর্বনিম্ন দরের ভ্রান্তি বনাম বাস্তবতাঃ যোগ্যতা ও চতুঃস্তরীয় মূল্যায়ন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Md. Moktar Hossain MCIPS, PMP, CPCM
Deputy Director (Xen)
Directorate of Design & Inspection-01
Bangladesh Power Development Board
Mobile: 01722044335
Email: moktar031061@gmail.com
=================================

 

বাংলাদেশের জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা (Public Procurement) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পিপিএ-২০০৬ এবং নতুন পিপিআর-২০২৫ (PPR-2025)-এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার (Value for Money) নিশ্চিত করে যোগ্যতম দরপত্রদাতাকে কার্যাদেশ প্রদান করা। তবে বর্তমানে অনেক দরপত্রদাতার মধ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভুল বোঝাবুঝি ও অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সাধারণ একটি অভিযোগ হলো – সর্বনিম্ন দর (Lowest Price) দেওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত আক্রোশে বা বেআইনিভাবে দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ দরপত্রদাতারই ধারণা কম যে, দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য পিপিআর অনুযায়ী ঠিক কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন এবং তাদের সেই সক্ষমতা দালিলিক প্রমাণের (Documentary Evidence) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কি না।

অনেকসময় গণমাধ্যমেও বিষয়টি ভূলভাবেই উপস্থাপিত হয়। সরকারি ক্রয়ে কেবল সর্বনিম্ন দরপত্রই যথেষ্ট নয়; বরং আইনগত, আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা যদি আদর্শ দরপত্র দলিল (STD) অনুযায়ী যথাযথভাবে প্রমাণিত না হয়, তবে কাউকে উত্তীর্ণ করা আইনত অসম্ভব। মূলত দলিলাদি উপস্থাপনের ত্রুটির কারণেই তারা বিজয়ী হওয়ার বদলে ‘অগ্রহণযো্গ্য’ (Non-responsive) হয়ে পড়েন।

এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো দরপত্রদাতাদের অস্পষ্টতা দূর করা এবং পিপিআর-২০২৫ এবং আদর্শ দরপত্র দলিল (STD) অনুযায়ী যোগ্যতার মানদণ্ড ও মূল্যায়নের স্তরগুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা, যাতে তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা যাচাই করে প্রতিযোগিতায় সফল হতে পারেন।

 

দরপত্রদাতার যোগ্যতা: সামর্থ্য ও দালিলিক প্রমাণের আবশ্যকতা


সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকার সবার থাকলেও, দরপত্র দলিলে বর্ণিত ‘ন্যূনতম যোগ্যতার মানদণ্ড’ (Minimum Qualification Criteria) পূরণ করা বাধ্যতামূলক। পিপিআর-২০২৫ এবং আদর্শ দরপত্র দলিল (STD) অনুযায়ী, আপনার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নির্ধারিত শর্তের চেয়ে সামান্য কম বিচ্যুতি হলেও আপনি আইনত অযোগ্য বিবেচিত হবেন। তাই দরপত্রে অংশগ্রহণের পূর্বেই নিজের সক্ষমতা যাচাই করা অপরিহার্য।

মনে রাখবেন, সরকারি ক্রয়ে কেবল যোগ্যতা থাকাই যথেষ্ট নয়, তার স্বপক্ষে ‘সুনির্দিষ্ট দলিলাদি’ (Documentary Evidence) দাখিল করা বাধ্যতামূলক; এখানে ‘মৌখিক সামর্থ বা ‘অঘোষিত যোগ্যতার’ কোনো স্থান নেই। আপনি যত বড় ঠিকাদারই হোন না কেন, সঠিক ফরম্যাটে অভিজ্ঞতার সনদ বা আর্থিক সামর্থ্য সংক্রান্ত যথাযথ সনদ জমা না দিলে মূল্যায়ন কমিটি আপনাকে অযোগ্য ঘোষণা করতে বাধ্য। সুতরাং, দরপত্র দাখিলের আগেই দরপত্রে উল্লেখিত প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং তা প্রমাণের প্রয়োজনীয় দলিলাদি নিশ্চিত করুন।

পিপিআর-২০২৫ এবং আদর্শ দরপত্র দলিল (PW3) এর আলোকে দরপত্রদাতার বিভিন্ন ক্যাটাগরির যোগ্যতা ও প্রমাণের দলিলাদির পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

দরপত্রদাতার যোগ্যতা, সামর্থ্য ও দালিলিক প্রমাণের আবশ্যকতার ছক

 

বিজয়ী হওয়ার পথ: দরপত্র মূল্যায়নের বিভিন্ন স্তর


অনেকের ধারণা সর্বনিম্ন দর দিলেই কার্যাদেশ নিশ্চিত, কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি দরপত্রকে চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হতে হলে মূল্যায়ন কমিটির (TEC) সূক্ষ্ম মূল্যায়নের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি জটিল ধাপ অতিক্রম করতে হয় যা একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং কঠোর ‘চতুঃস্তরীয় ছাঁকন পদ্ধতি’ (Four-stage Filtering Process) হিসেবে কাজ করে।

এই প্রক্রিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর কঠোর ধারাবাহিকতা। প্রতিটি ধাপ একটি ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে, যেখানে কেবল আগের ধাপের শর্তপূরণকারী যোগ্য দরপত্রই পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ পায়। কোনো দরপত্রদাতা যদি প্রথম ধাপেই অগ্রহণযোগ্য বা ‘নন-রেসপনসিভ’ হন, তবে সেখানেই তার দরপত্রটি পরিত্যক্ত বা বাতিল হবে। সেক্ষেত্রে তার কারিগরি দক্ষতা বা আর্থিক সাশ্রয়ী দর বিবেচনা করার আর কোনো আইনি সুযোগ মূল্যায়ন কমিটির থাকে না।

মূল্যায়নের এই চারটি ধাপ অনেকটা চার স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো, যা ক্রমানুসারে নিচে আলোচনা করা হলো:

ক. প্রাথমিক পরীক্ষা (Preliminary Examination)
খ. কারিগরি পরীক্ষা ও গ্রহণযোগ্যতা (Technical Examination and Responsiveness)
গ. আর্থিক মূল্যায়ন ও দর তুলনা (Financial Evaluation and Price Comparison)
ঘ. দাখিল উত্তর যোগ্যতা যাচাই (Post-qualification of the Tender)

নিচে এই স্তরগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এবং কোন পর্যায়ে একজন দরপত্রদাতা কেন ছিটকে পড়েন, তা ব্যাখ্যা করা হলো:

 

ক. প্রাথমিক পরীক্ষা: দরপত্রের প্রবেশদ্বার ও প্রথম ফিল্টার

দরপত্র মূল্যায়নের প্রথম এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল ধাপ হলো ‘প্রাথমিক পরীক্ষা’ (Preliminary Examination)। পিপিআর-২০২৫ এবং STD (PW3) এর ITT-46 ক্লজ অনুযায়ী, এটি মূলত একটি ‘চেকলিস্ট ভিত্তিক’ পরীক্ষা। এখানে আপনার যোগ্যতা বা দরের চেয়ে দাখিলকৃত দলিলাদির ‘পূর্ণাঙ্গতা’ ও ‘সঠিকতা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধাপে মূল্যায়ন কমিটি (TEC) যা যাচাই করে:

দরপত্র জামানত (Tender Security): এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। জামানতের পরিমাণ বা বৈধতার মেয়াদ শর্তের চেয়ে এক টাকা বা এক দিন কম হলেও দরপত্রটি সরাসরি বাতিল হবে। এছাড়া ইস্যুকারী ব্যাংক থেকে এর সত্যতা যাচাই করা হয়। সত্যতা প্রমাণিত নাহলে উক্ত দরপত্রদাতার দরপত্র বাতিলসহ দরপত্রদাতার বিরুদ্ধে প্রতারণামুলক কার্য হিসেবে পিপিএ-২০২৬ এর ধারা-৬৪ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

আবশ্যিক ফরম (Mandatory Documents): PW3-1, PW3-2 সহ সকল ফরম পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ ও স্বাক্ষরিত হতে হবে। কোনো ফরম অসম্পূর্ণ থাকলে বা স্বাক্ষরিত না থকলে দরপত্রটি ‘অসম্পূর্ণ’ হিসেবে বাতিল হবে।

দরসহ মূল্য তালিকা (Priced BOQ/Price Schedule): মূল্য তালিকা যথাযথভাবে পূরণ ও স্বাক্ষরিত হতে হবে অন্যথায় দরপত্র বাতিলযোগ্য।

কেন এই ধাপটি দরপত্রদাতাদের জন্য বিপজ্জনক?

পিপিআর অনুযায়ী মূল্যায়ন প্রক্রিয়া একটি ‘একমুখী রাস্তা’। প্রাথমিক পরীক্ষায় একবার ‘অগ্রণযোগ্য’ (Non responsive) হলে পরবর্তীতে সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। তখন আপনার যতই অভিজ্ঞতা বা সর্বনিম্ন দর থাকুক না কেন, মূল্যায়ন কমিটির কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

বাস্তব উদাহরণ: আপনি ৫ কোটি টাকার কাজে সর্বনিম্ন ৪.৮ কোটি টাকা দর দাখিল করেছেন এবং আপনার অভিজ্ঞতাও দরপত্র দলিলের TDS অনযায়ী যথাযথ আছে। কিন্তু TDS এ দরপত্র জামানত ১০ লক্ষ টাকা চাওয়া হলেও ইস্যুকারী ব্যাংক ভুলবশত ৮ লক্ষ টাকার গ্যারান্টি দিয়েছে। টাকার এই সামান্য ঘাটতির কারণেই আপনি কারিগরি বা আর্থিক মূল্যায়নের সুযোগ না পেয়ে শুরুতেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাবেন।

 

খ. কারিগরি পরীক্ষা ও গ্রহণযোগ্যতা: অভিজ্ঞতার মাপকাঠি ও সূক্ষ্ম যাচাই

প্রাথমিক পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার পর একটি দরপত্র দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিল্টার বা ছাঁকনিতে প্রবেশ করে, যাকে বলা হয় ‘কারিগরি পরীক্ষা ও গ্রহণযোগ্যতা’ নির্ধারণ। দরপত্রদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি এই ধাপেই তৈরি হয়।

অনেকেই মনে করেন, “আমি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কাজ করছি, আমার কয়েক কোটি টাকার সম্পদ আছে সাথে পর্যাপ্ত মেশিনারি আছে, তবুও কেন আমাকে অযোগ্য করা হলো ?”

আসলে কারিগরি মূল্যায়নে আপনার ‘সামগ্রিক সামর্থ্য’ যতটা না বিচার্য, তার চেয়ে বেশি বিচার্য হলো আপনি এই নির্দিষ্ট দরপত্রের শর্তগুলো (Specific Criteria) দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে পূরণ করেছেন কি না।

এই ধাপে মূল্যায়ন কমিটি (TEC) প্রধানত যা যাচাই করে:

সাধারণ অভিজ্ঞতা: দরপত্র দলিলের TDS এ চাওয়া নির্মাণ কাজে সাধারণ অভিজ্ঞতা, যা নিজ দেশের নিবন্ধন/গঠনতন্ত্র/লাইসেন্স সংক্রান্ত দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে।

সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা (Specific Experience): এটি দরপত্রদাতাদের বাদ পড়ার প্রধান কারণ। এখানে দরপত্র দলিলের TDS এ চাওয়া সরকারি খাতে (Public Sector) প্রস্তাবিত কাজের সমপ্রকৃতি, জটিলতা এবং নির্মাণ পদ্ধতি বা প্রযুক্তিসম্পন্ন কাজে প্রধান ঠিকাদার বা উপ-ঠিকাদার বা ব্যবস্থাপনা ঠিকাদার হিসেবে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

উদাহরণ: একটি দরপত্রে চাওয়া হয়েছে “৫ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত ১টি আরসিসি (RCC) ব্রিজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা”। দরপত্রদাতা হিসেবে আপনি ৫ কোটি টাকা মূল্যের ১০টি বিল্ডিং নির্মাণের অভিজ্ঞতা জমা দিলেন। কারিগরি মূল্যায়নে আপনি অগ্রহনযোগ্য (Non-responsive) হবেন, কারণ আপনার ‘ব্রিজ’ নির্মাণের সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা নেই।

গড় বার্ষিক নির্মাণ টার্নওভার (average annual construction turnover): দরপত্র দলিলের TDS এ চাওয়া সময়কাল এবং পরিমাণের গড় বার্ষিক নির্মাণ টার্নওভার (average annual construction turnover) থাকার প্রমাণক দাখিল করতে হবে। এই হিসেবে সামান্য ঘাটতি থাকলেও আপনি কারিগরিভাবে অযোগ্য হবেন।

আর্থিক সক্ষমতা: ন্যূনতম আর্থিক সম্পদের পর্যাপ্ততা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দাখিল করতে হবে।

সতর্কতা: ন্যূনতম পরিমাণের আর্থিক সম্পদ না থাকলে বা শর্তযুক্ত ক্রেডিট কমিটমেন্ট লেটার (Form PW3-8) দাখিল করা হলে আপনি কারিগরিভাবে অযোগ্য হবেন।

জনবল ও সরঞ্জাম (Personnel & Equipment): দরপত্রে চাওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার এবং সচল যন্ত্রপাতির তালিকা। সতর্কতা: আপনার সরঞ্জাম থাকলেও যদি সেগুলোর মালিকানা দলিল বা ভাড়ার বৈধ চুক্তিপত্র (Format অনুযায়ী) জমা না দেন, তবে আপনার সক্ষমতা শূন্য হিসেবে গণ্য হবে।

মৌলিক বিচ্যুতি (Material Deviation): কারিগরি স্পেসিফিকেশনে কোনো বড় ধরণের পরিবর্তন বা শর্তারোপ।

উদাহরণ: ক্রয়কারী চেয়েছে ‘ব্র্যান্ড নিউ’ জেনারেটর, কিন্তু আপনি আপনার প্রস্তাবে লিখলেন ‘রিকন্ডিশন্ড’ জেনারেটর সরবরাহ করবেন। এটি একটি মৌলিক বিচ্যুতি এবং এর কারণে কোনো আলোচনা ছাড়াই আপনার দরপত্র বাতিল হয়ে যাবে।

দরপত্রদাতাদের প্রতি বিশেষ বার্তা: পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী, কারিগরি মূল্যায়নের সময় মূল্যায়ন কমিটি আপনার কোনো ‘অসম্পূর্ণ দলিল’ নতুন করে গ্রহণ করতে পারে না (স্পষ্টীকরণ ছাড়া)। অর্থাৎ, আপনি যদি অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিতে ভুলে যান, তবে পরে তা জমা দেওয়ার সুযোগ নেই। এই কঠোর নিয়মটি দরপত্রদাতাদের কাছে প্রায়ই ‘বেআইনি বাদ দেওয়া’ বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু এটি মূলত প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা রক্ষার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।

মনে রাখবেন: কারিগরি গ্রহণযোগ্যতা হলো একটি ‘Pass/Fail‘ পদ্ধতি। এখানে ‘কমযোগ্য’ বা ‘বেশিযোগ্য’ বলে কিছু নেই। আপনি যদি শর্তের ১০০ ভাগের মধ্যে ৯৯ ভাগ পূরণ করেন আর ১ ভাগ পূরণ না করেন (যেমন: একটি ৫ বছরের অভিজ্ঞতার জায়গায় ৪ বছর ১১ মাস), তবে আপনি ‘ফেল’ বা অগ্রহণযোগ্যতা হিসেবেই গণ্য হবেন।

 

গ. আর্থিক মূল্যায়ন ও দর তুলনা: কেবল কম দরই কি জয়ের নিশ্চয়তা?

প্রাথমিক ও কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর একটি দরপত্র আর্থিক মূল্যায়নের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করে। দরপত্রদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো – “আমি যেহেতু সবার চেয়ে কম দর দিয়েছি, তাই কাজটা তো আমারই পাওয়ার কথা।” কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ‘উদ্ধৃত দর’ (Quoted Price) এবং ‘মূল্যায়িত দর’ (Evaluated Price) এর মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু আইনি ও গাণিতিক পার্থক্য রয়েছে। এর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র (Significantly Low-priced Tenders – SLT) সনাক্তকরণ এর বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায়, কেবল সর্বনিম্ন দর দিলেই কার্যাদেশ পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

আর্থিক মূল্যায়নের এই স্তরে মূল্যায়ন কমিটি (TEC) পিপিআর-২০২৫ এবং দরপত্র দলিলের আলোকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে থাকে:

১. মূল্যায়িত দর নির্ধারণ ও সমন্বয়: দরপত্রদাতা মূল্য তালিকা (Priced BOQ/Price Schedule) এ যে দর উল্লেখ করেন, সেটিই চূড়ান্ত নয়। কোনো দরপত্রে কারিগরিভাবে উত্তীর্ণ দরপত্রদাতাদের উদ্ধৃত দরের কোনো সমন্বয় (যেমন: কোনো আইটেমের দরের অসামঞ্জস্যতা বা অন্যান্য গাণিতিক বিষয়) প্রয়োজন হলে, সমন্বয় পূর্বক প্রকৃত ‘মূল্যায়িত দর’ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া দরপত্র দলিলে নেই এমন কোনো অতিরিক্ত বিকল্প প্রস্তাব বা অযাচিত সুবিধা (Unsolicited benefits) দেওয়া হলে তার আর্থিক মূল্য মূল্যায়নে বিবেচনা করা হয় না।

২. উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র (Significantly Low-priced Tenders – SLT) শনাক্তকরণ: কারিগরী মূল্যায়নে বিজয়ী দরপত্রদাতা সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও যে তিনি বিজয়ী হবেন, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।

পিপিআর-২০২৫-এর তফশিল-১৮ অনুযায়ী, সকল কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্য উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র কি না তা নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে যাচাই করা হয়।

সীমা নির্ধারণ পদ্ধতি: দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় (Official Estimate), কারিগরিভাবে উত্তীর্ণ অন্যান্য দরপত্রদাতাদের মূল্যায়িত দর এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক মূল্যসূচক (NPPI) এর ভিত্তিতে একটি গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র (Significantly Low-priced Tenders – SLT) সীমা নির্ণয় করা হয়।

মূল্যায়ন: যেসব দরপত্রের মূল্যায়িত দর এই নির্ণিত SLT সীমার নিচে অবস্থান করে, সেগুলো আর্থিকভাবে অগ্রহণযোগ্য (Non-responsive) হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, এই স্তরে আপনার দর অনেক উল্লেখযোগ্যরুপে কম হলেই আপনার দরপত্র সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে।

পরবর্তী প্রক্রিয়া: SLT হিসেবে শনাক্তকৃত দরপত্রসমূহ বাদ দিয়ে বাকি দরপত্রদাতাদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন দরদাতা থেকে সর্বোচ্চ দরদাতা পর্যন্ত ক্রমানুসারে তালিকা প্রস্তুত করা হয়।

৩. গ্রহণযোগ্য দরপত্রসমূহের দর তুলনা ও সমান দরের ক্ষেত্রে বিজয়ী নির্ধারণ (Tie-Breaking): আর্থিক মূল্যায়ন শেষে কারিগরি ও আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য দরপত্রসমূহের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতাকে (L1) নির্বাচন করা হয়। তবে যদি একাধিক দরদাতার মূল্য সমান (Tie) হয়, তবে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ক্রয়ের ক্ষেত্রে লটারির কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বিজয়ী দরদাতা নির্ধারণের জন্য নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরন করা হয়:

পূর্বতন পারফরম্যান্স (Past Performance): সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে যে দরদাতার পূর্ব কাজের রেকর্ড শ্রেষ্ঠ (সময়মতো কাজ শেষ করা, মান বজায় রাখা, কোনো লিকুইডেটেড ড্যামেজ বা এলডি আরোপ না হওয়া), তিনিই কার্যাদেশ পাবেন।

সতর্কতা: যদি সম-দরদাতার কারোরই উক্ত প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা না থাকে, তবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তাদের অতীত কর্মদক্ষতা যাচাই করা হবে। যার রেকর্ড যত স্বচ্ছ ও সফল, তিনিই জয়ী হবেন।

দরপত্রদাতাদের প্রতি বিশেষ বার্তা: আর্থিক মূল্যায়ন ধাপটি প্রমাণ করে যে সরকারি ক্রয় কেবল ‘সস্তা/কম’ দরের প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি ‘বাস্তবসম্মত’ দরের প্রতিযোগিতা। পিপিআর-২০২৫ এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আপনি যদি অতি উৎসাহী হয়ে নির্ণিত উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র (Significantly Low-priced Tenders – SLT) সীমার নিচে দর প্রদান করেন, তবে আপনার দরপত্রটি কারিগরি ভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার পরেও সরাসরি আর্থিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। তাই দরপত্র দাখিলের সময় বর্তমান বাজার মূল্যের সাথে সংগতি রেখে যৌক্তিক দর প্রদান করা অপরিহার্য।

 

ঘ. দাখিল-উত্তর যোগ্যতা যাচাই (Post-qualification)

সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতা (Lowest Evaluated Bidder) চিহ্নিত হওয়ার পর তার সামর্থ্য প্রমাণকসমুহের সঠিকতা যাচাই করা হয়। এটি অনেকটা ‘অডিট’ এর মতো।

যেভাবে যাচাই করা হয়:

দলিলাদি ভেরিফিকেশন: আপনার জমা দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টি, ক্রেডিট লাইন এবং কাজের অভিজ্ঞতার সনদগুলো সত্য কি না তা ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।

সরেজমিনে পরিদর্শন: টিইসি চাইলে আপনার সরঞ্জাম এবং জনবল দেখার জন্য আপনার অফিস বা চলমান কাজের সাইট পরিদর্শন করতে পারে।

সতর্কতা: যদি এই ধাপে আপনার কোনো তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে আপনার দরপত্র বাতিল হবে এবং পিপিএ-২০০৬ এর ধারা-৬৪ অনুযায়ী আপনার বিরুদ্ধে ‘বারিতকরণ’ (Debarment) বা কালো তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর টিইসি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার যোগ্যতা যাচাই করবে।

কেবলমাত্র সকল ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পর টিইসি উপযুক্ত দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদানের জন্য অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করে। অনুমোদন পাওয়ার পর বিজয়ী দরদাতাকে ‘নোটিফিকেশন অফ অ্যাওয়ার্ড’ (NOA) প্রদান করা হয়।

 

উপসংহার


পরিশেষে বলা যায়, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ‘নোটিফিকেশন অফ অ্যাওয়ার্ড’ (NOA) প্রাপ্ত হওয়া কেবল বাণিজ্যিক সাফল্য নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল আইনি পদ্ধতির সফল পরিণতি। পিপিআর-২০২৫ -এর আলোকে এটি এখন প্রমাণিত যে, কেবল ‘সর্বনিম্ন দর’ দিলেই বিজয়ী হওয়া যায় না। বরং প্রাথমিক বাছাই, কারিগরি সক্ষমতা এবং আর্থিক মূল্যায়নের মতো কঠোর ‘ছাঁকনি’ বা Filter অতিক্রম করেই একজনকে যোগ্য হতে হয়।

প্রকৃতপক্ষে, সবকটি ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর যার দর ‘উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র (Significantly Low-priced Tenders – SLT) সীমার উপরে থাকে, কেবল সেই সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতাকেই ‘দাখিল-উত্তর যোগ্যতা’ যাচাই সাপেক্ষে ‘নোটিফিকেশন অফ অ্যাওয়ার্ড’ (NOA) প্রদান করা হয়। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে বা না বুঝে দরপত্র জমা না দিয়ে, আগে নিজের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় দলিলাদি যাচাই করা একজন পেশাদার ঠিকাদারের প্রধান কাজ।

অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রদাতাগণ যথাযথ যোগ্যতা বা দলিলাদির অভাবে অগ্রহণযোগ্য (Non-responsive) হয়ে ঢালাওভাবে অভিযোগ তোলেন যে, ষড়যন্ত্র বা অনিয়ম করে সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গাণিতিক সূত্র ও আইনি মানদণ্ড অনুসরণ করে যখন কোনো দরপত্র কারিগরি শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয় বা তার প্রদত্ব দর উল্লেখযোগ্যরুপে নিম্নমূল্যের দরপত্র (Significantly Low-priced Tenders – SLT) সীমার নিচে চলে যায় , তখন মূল্যায়ন কমিটির পক্ষে তাকে বিজয়ী করার কোনো সুযোগ থাকে না।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হয় না, তা গ্যারান্টি দিয়ে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই অনিয়মের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ না তুলে যদি সত্যিকারের অনিয়মের কোনো প্রমাণ থাকে, তবে পিপিএ-২০০৬ এর ধারা-২৯ এবং পিপিআর-২০২৫ এর বিধি-৭২ থেকে বিধি-৭৭ পর্যন্ত বিধিসমূহ অনুসরনপূর্বক যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দাখিলের সুযোগ রয়েছে। এই আইনি পথ অনুসরণের মাধ্যমেই একজন দরপত্রদাতা তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেন।

সবশেষে, স্বচ্ছতা ও সততার সাথে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং আইন ও বিধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই সরকারি ক্রয়ে সফল হওয়ার একমাত্র স্বীকৃত পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

PPR-2025 সংক্রান্ত আলোচনা

সরকারি ক্রয়ের আয়নাঃ ক্রয় প্রক্রিয়া-উত্তর পুনরীক্ষণ

প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

Read More »
Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors
গ্রাহক হোন

শুধুমাত্র Registered ব্যবহারকারিগন-ই সব ফিচার দেখতে ও পড়তে পারবেন। এক বছরের জন্য Registration করা যাবে। Registration করতে এখানে ক্লিক করুন

** সীমিত সময়ের জন্য Discount চলছে।

প্রকিউরমেন্ট বিডি সম্পর্কে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে অনুরোধ করছি।

আপনার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ আমাদের সেবা উন্নত করতে সহায়ক হবে।

ফ্রী রেজিস্ট্রেশন

“প্রকিউরমেন্ট বিডি news”, “সমসাময়িক”, “সূ-চর্চা”, “প্রশিক্ষণ” অথবা “ঠিকাদারী ফোরাম” ইত্যাদি বিষয়ে কমপক্ষে ২টি নিজস্ব Post প্রেরণ করে এক বছরের জন্য Free রেজিষ্ট্রেশন করুণ। Post পাঠানোর জন্য “যোগাযোগ” পাতা ব্যবহার করুণ।

সূচীঃ PPR-25

সর্বশেষ

Scroll to Top