প্রথম ৯ মাসে ৬০% ব্যয় না হলে ৪র্থ কিস্তির অর্থছাড় বন্ধ
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয় (অর্থ বিভাগ) একটি কঠোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। অপরিকল্পিত বাজেট বাস্তবায়ন, শেষ মুহূর্তের খরচের হিড়িক, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপচয় রোধের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫) অর্থ বিভাগের জারি করা এক পরিপত্রে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে অর্থাৎ প্রথম ৯ মাসে বাজেট বরাদ্দের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে চতুর্থ প্রান্তিকের অর্থছাড় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি সংস্থাগুলো তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যে নির্ধারিত এই কোটা পূরণে ব্যর্থ হলে চতুর্থ কিস্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে দেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের কারণসমূহ:
- অপরিকল্পিত ও শেষ মুহূর্তের ব্যয় রোধ: অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপরিকল্পিতভাবে বাজেট বাস্তবায়নের ফলে অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে খরচের হিড়িক পড়ে যায়। তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে প্রায়শই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয় হয়, যা রোধ করাই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
- ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ: বিগত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় অর্থবছরের শুরুতে ধীরগতিতে চলে। বিশেষ করে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মেরামত ও সংরক্ষণ, নির্মাণ ও পূর্ত এবং মালপত্র কেনার মতো খাতে অর্থবছরের শেষ দিকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে, শেষ মুহূর্তে প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে দ্রুত অর্থ ছাড় ও ব্যয় করা হয়, যা সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা কঠিন করে তোলে এবং সীমিত সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, অপচয় ও অনিয়ম ঘটায়।
- আর্থিক শৃঙ্খলা ও সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণ: সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার একটি প্রধান কারণ হলো রাজস্ব আহরণ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সময়মতো বাজেট বাস্তবায়ন অপরিকল্পিত সরকারি ঋণ এড়াতে এবং ‘বরোয়িং কস্ট’ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো সম্ভব করবে। এছাড়া, শেষ মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত ঋণ গ্রহণ আর্থিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে।
- কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন: প্রতিপালনীয় পদ্ধতি যথাযথ অনুসরণ না করে অর্থ ব্যয়ের ফলে সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়। এই কঠোর পদক্ষেপ আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে সরকারের উদ্দেশ্য পূরণে সাহায্য করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিকে খরচ হয়েছিল মাত্র ৯৬ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ১২.৪৭ শতাংশ। উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই চিত্র ছিল আরও হতাশাজনক, যেখানে প্রথম তিন মাসে বরাদ্দের মাত্র ৩.৭৫ শতাংশ খরচ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে খরচের গতি বাড়লেও, সংশোধিত লক্ষ্য পূরণের জন্য শেষ মাসেই ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছিল, যেখানে আগের ১১ মাসে গড় মাসিক ব্যয় ছিল ৪৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। এই ধরনের প্রবণতা এড়াতেই অর্থ বিভাগ এই নতুন নির্দেশনা দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
Reference: প্রথম ৯ মাসে ৬০% ব্যয় না করলে অর্থছাড় বন্ধ
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

SLT: টেন্ডারে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় (Public Procurement) দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল অস্বাভাবিক কম দর (Abnormally Low Bid – ALB)

NOA অটোমেটিক accepted দেখাচ্ছে। এখন করণীয় কি ?
একটি টেন্ডারে কর্তৃপক্ষ আমার প্রতিষ্ঠানের নামে NOA (Notification of Award) ইস্যু করেছে, ই-জিপিতে মেসেজ এসেছে। কিন্তু আমি এক্সেপ্ট করতে গিয়ে

NEOM & The Line: একটি কৌশলগত প্রকল্প এবং ক্রয় পরিকল্পনার মহাবিপর্যয়
বিস্তারিত দেখুনঃ NEOM & The Line: একটি কৌশলগত প্রকল্প এবং ক্রয় পরিকল্পনার মহাবিপর্যয়

Individual Consultancy চুক্তিতে ভ্যাট এবং আয়করের হার নিয়ে হতাশা
বিস্তারিত দেখুনঃ ব্যক্তি পরামর্শক (Individual Consultant) চুক্তিতে ভ্যাট এবং আয়করের হার নিয়ে হতাশা