আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬ জারীঃ সরকারি ক্রয় ও ব্যয় প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো পরিবর্তন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০১৫’ বাতিল করে নতুন ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬ (Delegation of Financial Power 2026)’ জারি করেছে অর্থ বিভাগ। সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ক্রয় কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই আদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে আরও দেখুনঃ
- “আর্থিক ক্ষমতা অর্পন ২০১৫” সংশোধনীর জন্য আর কত অপেক্ষা !
- ডেলিগেশন অফ ফাইন্যান্সিয়াল পাওয়ার (DOFP) কি ?
পরিচালন এবং উন্নয়ন বাজেট (Development budget) এর এই নতুন আদেশটি সরকারি ক্রয়, বাজেট পুনর্বণ্টন, আপ্যায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহকে আর্থিক বিষয়গুলো নিজস্ব দায়িত্বে দ্রুত সমাধানের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।
আদেশটি দেখতে ক্লিক করুণঃ আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬
কেন এই পরিবর্তন?
২০১৫ সালের আদেশটি প্রায় এক দশক ধরে কার্যকর ছিল। এই সময়ের মধ্যে সরকারি প্রকল্পের পরিসর ও ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্রয় ব্যবস্থা, বিশেষ করে ই-জিপি পোর্টালের ব্যবহার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। পাশাপাশি বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থায় নতুন শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি (BACS) চালু হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো আদেশ অনেক ক্ষেত্রে সময়োপযোগী ছিল না, যার ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিচ্ছিল। এসব বিবেচনায় নতুন করে আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্বল্প সময়ে উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও এই সংস্কার আনা হয়েছে।
অতি সম্প্রতি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫ (পিপিআর ২০২৫) জারী করা হয়েছে। পিপিআর-২০২৫ এর অনেক ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হয়েছে। ফলে, আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ সংক্রান্ত বিদ্যমান আদেশে অনুন্নয়ন (পরিচালন) এবং উন্নয়ন বাজেটের আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্রকারের ব্যয়ের আইটেমের বিপরীতে বিদ্যমান অর্পিত ক্ষমতার পার্থক্য রয়েছে। এখন, অধ্যাদেশ ও পিপিআর-২০২৫ এর সাথে সমন্বয় করে নতুন আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ জারী করা প্রয়োজন।
এই নতুন আদেশ কার্যকর হলে সরকারি দপ্তরগুলোর আর্থিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষও দ্রুত সেবা পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।
নতুন আদেশের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন সাংযুক্ত দপ্তরসমূহের পদ সৃষ্টি, বিলুপ্তকরণ এবং সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের ক্ষমতা স্পষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া নতুন পদ স্থায়ীকরণ এবং বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নমনীয়তা আনা হয়েছে।
নতুন আদেশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা, প্রশাসনিক স্তরে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করা। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোকে কার্যকর ক্ষমতা প্রদান করাও এই আদেশের অন্যতম লক্ষ্য।
নতুন আদেশে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও দপ্তরের জন্য ব্যয়ের অনুমোদন সীমা হালনাগাদ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানোর প্রয়োজন কমবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিজ উদ্যোগে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এর ফলে সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার সাথে সমন্বয়ঃ সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও নতুন আদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী টেন্ডার অনুমোদন, দরপত্র মূল্যায়ন এবং চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে ক্ষমতা বণ্টন আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। বিশেষ করে ই-জিপি পোর্টালের মাধ্যমে পরিচালিত ক্রয় প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে এবং অনুমোদনজনিত জটিলতা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় ক্রয়ের সীমা বাড়লো: জরুরি প্রয়োজনে সরকারি দপ্তরগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি টাকার সামগ্রী স্থানীয়ভাবে কিনতে পারবে। নতুন আদেশ অনুযায়ী, ছোটখাটো বা জরুরি প্রয়োজনে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যের দ্রব্যাদি স্থানীয়ভাবে ক্রয় করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে (যা আগে কম ছিল)।
স্থায়ী অগ্রিমের সীমা বৃদ্ধি: দৈনন্দিন কাজের গতি রাখতে স্থায়ী অগ্রিম (Permanent Advance) তোলার সীমা বাড়িয়ে ১৫ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। এতে অফিসের ছোটখাটো খরচের জন্য বারবার অর্থ বিভাগের অনুমোদনের ঝামেলা কমে আসবে।
আপ্যায়ন বা খাবারের খরচ: সেমিনার, সভা বা প্রশিক্ষণের আপ্যায়ন ব্যয়ের নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। হালকা নাস্তা বা আপ্যায়নের জন্য জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৮০ টাকা এবং দুপুরের বা রাতের খাবারের জন্য জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করার অনুমতি থাকবে।
অনাদায়ী বিল মওকুফ: সরকারি কর্মচারীদের অনাদায়ী ঋণ বা অগ্রিমের অর্থ যদি আদায় করা সম্ভব না হয়, তবে তা মওকুফ বা অবলুপ্ত করার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
বাজেট পুনর্বণ্টন: বাজেটের অর্থ এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তর (Reappropriation) বা রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে অদলবদলের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের কাজ থেমে থাকার ঝুঁকি কমবে।
বৈদেশিক ভ্রমণ ভাতা: মন্ত্রী, সচিব বা সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের বৈদেশিক ভ্রমণে আপ্যায়ন বা হস্তান্তর ভাতার (Hospitality) নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে আপ্যায়ন ভাতা ৮০০ মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ৩০০ ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-জিপি (e-GP) পোর্টালে গত কয়েকদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটির ধীরগতি এবং যান্ত্রিক

সরকারি ক্রয়ে রেকর্ড ব্যবস্থাপনাঃ আইনি কাঠামো ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা
প্রকৌ: মো: মোকতার হোসেন MCIPS, PMP, CPCM উপ-পরিচালক (নির্বাহী প্রকৌশলী) নক্সা ও পরিদর্শণ-১ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭২২০৪৪৩৩৫ ইমেইল: moktar031061@gmail.com

লাম্প সাম নাকি টাইম-বেসড কন্ট্রাক্ট – কোনটি কখন ব্যবহার করবেন ?
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ে প্রধানত কাজের ধরন ও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হয়।

লাম্প সাম কন্ট্রাক্ট (Lump Sum Based Contracts) কি ? কখন ব্যবহার করবেন ?
সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো প্রকল্পে দক্ষ পরামর্শক (Consultant) নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সঠিক চুক্তিপত্র নির্বাচন করা। বাংলাদেশ পাবলিক