প্রকল্পের পিডি কি বাইরে থেকে নিয়োগ দেয়া যাবে ?
সম্প্রতি প্রকল্প পরিচালক (PD: Project Director) নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পিডি নিয়োগ করা হবে। বিষয়টি সচরাচর ঘটে না জন্যই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
নিচে সার্কুলারটি দেয়া হলোঃ

সেক্ষেত্রে এই প্রশ্নটা সামনে চলে এসেছেঃ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর/অধিদপ্তর/সংস্থার বা মন্ত্রণালয়ের বাইরের কোন কর্মকর্তাদের বা অবসরপ্রাপ্ত বা বিশেষজ্ঞ পুল থেকে বা প্রেষণ (Deputation) বা সম্পুর্ন ফ্রিল্যান্স কাউকে কি নিয়োগ দেয়া যাবে ?
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, গতিশীলতা বজায় রাখা এবং সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পরিপত্র আছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুনঃ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে পিডি নিয়োগ কিভাবে হয়?
তারপরও এই প্রশ্নটা আসছে ? উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তার পরিবর্তে বাইরের কাউকে বা প্রেষণে (Deputation) পিডি নিয়োগের উদাহরন কি বাংলাদেশে আছে ?
হ্যাঁ, বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বাইরের কর্মকর্তা বা প্রেষণ (Deputation) -এ প্রকল্প পরিচালক (PD) নিয়োগের অনেক নজির রয়েছে। যদিও, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদন নির্দেশিকা‘র সংযোজনী ঊ তে উল্লেখিত পরিপত্রের ৪.৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাস্তবায়নকারী সংস্থার যোগ্য ও উপযুক্ত কর্মকর্তাদের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে, প্রশাসনিক বা বিশেষায়িত প্রয়োজনে উপযুক্ত যোগ্যতা যাচাই সাপেক্ষে প্রেষণে বাইরের কর্মকর্তা নিয়োগ করা যাবে না এরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই এবং তা নিয়মিতই চর্চা করা হচ্ছে। প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার থেকে কর্মকর্তাদের এনে পিডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিচে কিছু উদাহরন দেখা যাকঃ
আশ্রয়ণ প্রকল্প: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত এই বিশাল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে সাধারণত মাঠ প্রশাসন বা বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের বাইরের কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প: দেশের অন্যতম বৃহৎ এই মেগা প্রকল্পে সেতু বিভাগের নিজস্ব কর্মকর্তার পাশাপাশি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ও অন্যান্য দপ্তরের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিসি (BRTC) বাস প্রকিউরমেন্ট বা ডিপো নির্মাণ প্রকল্প: পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতাভুক্ত কর্মকর্তাদের বাইরে থেকেও প্রেষণে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের উদাহরণ রয়েছে।
আইসিটি প্রকল্পসমূহ: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC) বা মন্ত্রণালয়ের বাইরের কর্মকর্তাদের পিডি হিসেবে প্রেষণে পদায়ন করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে “এক কর্মকর্তাকে এক প্রকল্পের পিডি” নিয়োগের নির্দেশনা আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক সংস্থায় দাপ্তরিক দৈনন্দির কার্যক্রমের বাইরে প্রকল্প চালানোর জন্য প্রকল্প পরিচালক হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ কর্মকর্তা নেই। রেগুলার কর্মকর্তার চেয়ে প্রকল্প বেশি। তাই এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডি করা হয়। এক্ষেত্রে, একাধিক প্রকল্পের পিডি নিয়োগ পরিহার করতেই প্রশাসন থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়। অনেক সময় বিকল্প হিসেবে প্রকল্প সংখ্যা কমিয়ে আনা কিংবা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিভিন্ন চেষ্টাও দেখা যায়।
এ বিষয়ে ২টি সংবাদ দেখুনঃ
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিয়মিত কর্মকর্তা ব্যতিত মোটামুটি ৩ ভাবে প্রকল্পে পিডি নিয়োগ হয়ে থাকে – প্রশাসন থেকে প্রেষণে নিয়োগ, সাবেক বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ। এসব প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষে-বিপক্ষে মত এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।
প্রশাসন থেকে প্রেষণে নিয়োগ
প্রশাসনে কাজের গতিশীলতা সচল রাখতে এবং ইন-সার্ভিস (কর্মরত) কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রকল্পগুলোতে প্রেষণে কর্মরত কর্মকর্তাদের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে অনেক সময় উৎসাহিত করে। তবে, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এ সমস্যা সমাধানে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রেষণে পিডি নিয়োগ করা হলে হিতে বিপরীত হবার আশংকা আছে। কারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের যে কারিগরি জ্ঞান ও প্রকৌশল দক্ষতা প্রয়োজন তা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের থাকে না। একজন প্রকৌশলী ১০-১৫ বছর চাকরি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পিডি হিসেবে নিয়োগ দিতে পুল গঠনের ভাবনা এবং জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রেষণে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে অনেক ক্ষোভ আছে। প্রকৌশলীদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) এ ধরনের নিয়োগের তীব্র বিরোধী।
দেখুনঃ উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি হিসেবে প্রকৌশলীদের নিয়োগের দাবি
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রেষণে পিডি নিয়োগের চিন্তা প্রকৌশলীদের প্রতি চলমান বঞ্চনাকে বাড়াবে বলে অভিমত। তারা বলছেন, সব কিছুতেই প্রশাসন ক্যাডারকে প্রাধান্য দেওয়ার মনোভাবের প্রতিফলন হয় এমন চিন্তায় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা চাকরিতে যে সুযোগ-সুবিধা ও দ্রুত পদোন্নতি পান, তার তুলনায় প্রকৌশলীরা অনেক পিছিয়ে। তারা যদি এখন পিডি হন, তাহলে প্রকৌশলীরা কী কাজ করবেন!
সাবেক বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ
আবার, সাবেক বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ নিয়েও অনেক মতভেদ আছে।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪৯ (১) ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে চাকরি থেকে অবসরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারেন। তবে প্রকল্প পরিচালন ব্যবস্থার দক্ষতা নিশ্চিত করতে সরকার এবং পরিকল্পনা কমিশন নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থাকে (সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদন নির্দেশিকার সংযোজনী ঊ এর পরিপত্র)। দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকলে বা বিশেষায়িত কারিগরি প্রকল্প হলে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়াতে কোন বাঁধা নেই।
নিচে একটি উদাহরন দেখুনঃ

কিন্তু, এভাবে নিয়োগে ইন-সার্ভিস বা কর্মরত যোগ্য কর্মকর্তারা কম সুযোগ পেতে পারেন। ফলে তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা এবং কাজের আগ্রহ হ্রাসের আশঙ্কা থাকে। মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি বাধাগ্রস্থ হতে পারে। আবার, এসব অবসরপ্রাপ্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা নিয়মিত চাকরিজীবী না হওয়ায় অনেক সময় তাদের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা অনিয়মের বিরুদ্ধে স্থায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু চুক্তিভিত্তিক পিডি নিজের চাকরির মেয়াদ বাড়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। এই ধরণের নিয়োগে অনেক সময় মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত লবিং বা তদবিরের সুযোগ তৈরি হওয়ার সমালোচনা থাকে।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ
এভাবে পিডি নিয়োগ কিন্তু নতুন নয়। একদম প্রথমেই একটি উদাহরন দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের উপরের সার্কুলারটি দেখে বোধগম্য যে, এখানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হলেও শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তারাই আবেদনে যোগ্য হবেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ইতিপূর্বেকার নিয়োগ দেখুনঃ সার্কুলার
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ হলো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি আধুনিক ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপ। বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত বড় বড় মেগা প্রকল্পে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পিডি নিয়োগ দিলে বৈশ্বিক আস্থা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে কেবল জ্যেষ্ঠতা বা লবিংয়ের জোরে নয়, বরং নির্দিষ্ট খাতের দক্ষতা ও কারিগরি যোগ্যতা যাচাই করে সঠিক ব্যক্তিকে পিডি বানানো সম্ভব হয়।
তবে, একেবারেই বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া একজন পিডির পক্ষে স্থায়ী সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের পরিচালনা করা কঠিন হবে। সরকারি প্রশাসনিক কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Business) না বোঝার কারণে ফাইন্যান্সিয়াল ফাইল অনুমোদন এবং অডিট নিষ্পত্তিতে গতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় “উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা” কেবলই নামে মাত্র বা আইওয়াশ, যেখানে নেপথ্যে আগের মতোই পছন্দের কোনো ব্যক্তিকে বসানোর জন্য শর্তাবলি (Criteria) সাজানো থাকে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

অত্যধিক নিম্নদরের দরপত্র কি চক্রান্তমূলক কর্ম ?
বিস্তারিত দেখুনঃ “অত্যধিক নিম্নদরের দরপত্র” বনাম “চক্রান্ত”: একটি বিশ্লেষণ

“অত্যধিক নিম্নদরের দরপত্র” বনাম “চক্রান্ত”: একটি বিশ্লেষণ
সম্প্রতি বিপিপিএ (BPPA: Bangladesh Public Procurement Authority) হতে অত্যধিক নিম্নদরে দরপত্র দাখিল হওয়ার নিয়ে একটি পরিপত্র জারী হয়েছে যেখানে এই

ন্যাশনাল প্রকিউরমেন্ট ট্রেইনার নিয়োগ ২০২৬ | BPPA Trainer Pool
বিস্তারিত দেখুনঃ ন্যাশনাল প্রকিউরমেন্ট ট্রেইনার পুল সম্প্রসারণ হচ্ছেঃ আবেদনের বিস্তারিত জানুন

SLT টেন্ডারে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা !! এনালাইসিস করে যা পাওয়া গেল
বিস্তারিত দেখুনঃ SLT: টেন্ডারে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ