অধ্যাদেশ জারীর পরও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সংস্কার আটকে আছে কেন !
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গত ৪ঠা মে ২০২৫ ইং তারিখে “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” জারী করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা ও টেকসই পাবলিক প্রকিউরমেন্টকে আরও গুরুত্ব দেওয়া এবং সিন্ডিকেট ভাঙা।
এই অধ্যাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো সরকারি কেনাকাটায় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির অধীন অভ্যন্তরীণ কার্যক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের ১০% এর কম বা বেশি হলে টেন্ডার প্রস্তাব বাতিলের যে বিধান ছিল, তা বাতিল করা। এই সিদ্ধান্ত ২০ মার্চ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নেওয়া হয়েছিল।
দেখুনঃ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারী
দেখুনঃ সরকারি কেনাকাটায় ১০% মার্জিন বাতিল নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত
তবে, এই অধ্যাদেশের পুরোপুরি প্রয়োগের জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ (PPR-08) এর সংশ্লিষ্ট বিধি সমূহে প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ এখনও বাকি রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় আড়াই মাসেও অধ্যাদেশের সংশোধনীগুলো PPR‑08-এ প্রতিফলিত না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
ক্রয় কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়নে নতুন নির্দেশিকা থাকলেও বিধিমালা না থাকায় কর্মকর্তারা সঠিক পদ্ধতি অনুসরণে দ্বিধাগ্রস্ত। বিধি-সংশোধন না হওয়ায় ব্যবহারকারিদের মধ্যে দ্বিচারিতা ও সংশয় দেখা দিচ্ছে, কোন নিয়ম প্রযোজ্য হবে – ২০০৮-এর পুরাতন নীতি নাকি নতুন অধ্যাদেশ ? ফলে দলিলভূক্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
১০% মার্জিন বাতিলের প্রেক্ষাপট
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এর ধারা ৩১ এর উপধারা (৩) অনুযায়ী, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সরকারি কেনাকাটার কার্যের ক্ষেত্রে কোনো দরদাতা দরপত্রের দাপ্তরিক প্রাক্কলনের ১০ ভাগ কম বা বেশি মূল্য দরপত্রে উল্লেখ করলে দরপত্র বাতিল হয়ে যেত। এই আইন জারি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিতর্ক ও আন্দোলন দেখা দেয় এবং এটি বাতিলের দাবি ওঠে।
এই দরসীমা ঠিক করার কারণে সরকারি কেনাকাটায় নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছিলো। এতে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা কমে যায়, এবং বড় ঠিকাদারেরা বারবার বেশি কাজ পেতেন, যা সিন্ডিকেট তৈরিতে সহায়ক ছিল।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও সরকারি কেনাকাটার এসব দুর্বলতা উঠে আসে। পূর্বের কাজের মূল্যায়নের জন্য যে ম্যাট্রিক্স ছিল, যা একই প্রতিষ্ঠানকে বার বার কাজ পেতে সাহায্য করতো, সেটি বদলে নতুন সক্ষমতা ম্যাট্রিক্স করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সিন্ডিকেট ভাঙতে সহায়তা করবে।
সংশোধনী অধ্যাদেশ প্রয়োগ না হওয়ার সমস্যা ও ঝুঁকি
এই অধ্যাদেশ ২০০৬ সনের ২৪ নং আইন, অর্থাৎ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ (PPA 2006)-এ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুনঃ উল্লেখযোগ্য সংশোধনীগুলো কি কি
যদিও “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” জারী হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা, তবে এর পুরোপুরি প্রয়োগের জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ (PPR-08) এর সংশ্লিষ্ট বিধি সমূহে প্রয়োজনীয় সংশোধন লাগবে। এই বিধিমালা সংশোধন না হলে নিম্নলিখিত সমস্যা ও ঝুঁকি দেখা দিতে পারে:
- অস্বাভাবিক নিম্ন দর প্রস্তাবের ঝুঁকি: ১০% সংক্রান্ত বিধান প্রত্যাহার করা হলে ঠিকাদারদের যোগসাজশে অস্বাভাবিক নিম্নদর প্রস্তাবের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। যদিও অধ্যাদেশে “যৌক্তিকভাবে উল্লেখযোগ্য কম মূল্য (significantly low price)” যুক্ত দরপত্র মূল্যায়নে নতুন বিধান এবং আলোচনার (Negotiation) নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে, এই বিধানগুলোর বিস্তারিত কার্যপ্রণালী এবং প্রয়োগ পদ্ধতি বিধিমালায় সুস্পষ্ট না হলে এটি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা কঠিন হতে পারে।
- অধ্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা অর্জনে বিলম্ব: অধ্যাদেশের লক্ষ্য হলো সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা ও টেকসই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নিশ্চিত করা। বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন না হলে এই মহৎ লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জনে বাধা সৃষ্টি হবে বা বিলম্ব হবে, কারণ আইনের নতুন দিকগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য বিস্তারিত বিধি-বিধান অপরিহার্য।
- নতুন সংযোজন ও প্রক্রিয়ার অকার্যকারিতা: অধ্যাদেশে নতুন করে প্রকিউরমেন্ট কৌশল, ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট, রিভার্স অকশন, উপভোগকারী মালিকানা, এবং বিভিন্ন ক্রয় পদ্ধতির পরিবর্তিত নিয়মাবলী যুক্ত করা হয়েছে। PPR-08 এর সংশোধনী ছাড়া এই নতুন সংযোজন ও প্রক্রিয়াগুলো বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন হবে, যার ফলে আইনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে সফল হবে না।
- e‑GP বাধ্যতামূলক ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে নাঃ অধ্যাদেশে e‑GP বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হলেও, সংশ্লিষ্ট PPR‑08 মোতায়েন না হওয়ায় তা কার্যত ব্যবহারে বাধা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান অধিদপ্তরগুলোতে ৩৫–৬৫% প্রকিউরমেন্টই এখনও e‑GP ছাড়া হচ্ছে।
পিপিআর-০৮ এর দ্রুত সংশোধনী অপরিহার্য
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য PPR-08 এর দ্রুত সংশোধনী অপরিহার্য, কারন:
- সরকারি কেনাকাটায় সিন্ডিকেট ভাঙা এবং প্রকৃত স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এই অধ্যাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধিমালা সংশোধিত না হলে এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
- অস্বাভাবিক নিম্ন দর প্রস্তাবের মতো সম্ভাব্য ঝুঁকি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য বিধিমালায় বিস্তারিত এবং সুস্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা জরুরি।
- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং প্রতিযোগিতামূলক করতে অধ্যাদেশে আনা পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালাকে এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অত্যন্ত জরুরি।
- অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে যে নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে PPR-08 এর সংশোধনী অপরিহার্য
উপসংহার
“পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” সরকারি কেনাকাটায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই অধ্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা অর্জন এবং এর উদ্দেশ্য সফল করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ (PPR-08) এর দ্রুত সংশোধন অত্যন্ত জরুরি।
দ্রুত বিধিমালা সংশোধন করে আইনটিকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা হলে সরকারি কেনাকাটায় কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, কার্যকর ফলাফল পাওয়ার জন্য বিধিমালার সংশোধনের পাশাপাশি ই-জিপি (e-GP) পোর্টালেও প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।
এই লেখকের অন্যান্য লেখা

১টি ৩৫ কোটি টাকার রাস্তার কাজ যা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছিল। এখন, কাজ চলাকালীন ভেরিয়েশন লাগবে। কিছু আইটেমের কাজ কমে যাওয়ায় ৩৫ কোটি টাকার মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করা যাবে। সমস্যা হলো, ৫টি Non-Tender আইটেম লাগবে যা সব মিলে ৩.৫ কোটি টাকার। এখন, এক্ষেত্রে কি ভেরিয়েশন লাগবে ? কে অনুমোদন দিবে, মন্ত্রণালয় নাকি HOPE ?
চুক্তি সম্পাদনের পর হতে উক্ত চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন বা বাতিল পর্যন্ত সময়ে প্রশাসনিক, আর্থিক, ব্যবস্থাপনাগত ও কারিগরী কারনে চুক্তির ভেরিয়েশন

রেডিও Talk: আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট দিবস
বিস্তারিত দেখুনঃ আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট দিবস

রেডিও Talk: ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ
বিস্তারিত দেখুনঃ ই-জিপি সাইটে ভোগান্তি: ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ, কবে মিলবে সমাধান ?

রেডিও Talk: ই-জিপিতে ব্যক্তি পরামর্শকদের রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়ে বৈষম্য
বিস্তারিত দেখুনঃ ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন ফিঃ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পরামর্শকদের মধ্যকার বৈষম্য